তান্ত্রিক পরমব্রতর নতুন চাল! শাশ্বত-অর্জুনের ‘রক্তফলক’ কি হাড়হিম করতে পারল?

বাংলা সাহিত্যে তন্ত্র, মন্ত্র আর অতিপ্রাকৃত গল্পের টানটান রোমাঞ্চ চিরকালই পাঠকদের পছন্দের। লেখক অভীক সরকারের কলমে ‘পর্ণশবরীর শাপ’ বা ‘ভোগ’-এর পর এবার হইচই-এর পর্দায় হাজির হলো নতুন ওয়েব সিরিজ ‘রক্তফলক’। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এই সিরিজটি নিয়ে প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে, বিশেষ করে যখন প্রধান চরিত্রে রয়েছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা। কিন্তু মুক্তির পর সিরিজটি কি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল?

গল্পের প্রেক্ষাপট ও টাইমলাইন:
সিরিজের শুরু হয় বালুরঘাটের দত্তগুপ্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে। ভুলবশত একটি অদ্ভুত বৌদ্ধ দেবীমূর্তির ফলক তাদের ঠাকুরঘরে ঠাঁই পায়, আর তারপর থেকেই শুরু হয় অশুভের আনাগোনা। রক্তমাখা প্রেতিনীমূর্তিদের হাত থেকে বাঁচতে পরিবারটি স্মরণাপন্ন হয় বিখ্যাত তন্ত্রসাধক আগমবাগীশের (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়)। অন্যদিকে, পরিবারের কিশোরী কন্যা তিতলি (মোহনা মাইতি) ফেসবুকের বন্ধু স্যমন্তকের (অর্জুন চক্রবর্তী) প্রেমে পড়ে দুই বোনকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালায়।

পরিচালক পরমব্রত এখানে তিনটি আলাদা টাইমলাইন ব্যবহার করেছেন। একটি হাজার বছর আগের সোমপুর মহাবিহারের প্রেক্ষাপট, যেখানে সিদ্ধিলাভের জন্য তিন কিশোরীকে বলি দেয় বজ্রকেতু (অর্জুন)। অন্যটিতে এক মানসিক বিকারগ্রস্ত যুবক ও তার মায়ের (কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) করুণ কাহিনি। এই তিন সুতো কীভাবে এক বিন্দুতে এসে মিলবে, তাই নিয়েই এগোয় চিত্রনাট্য।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি:
অভিনয়ের দিক থেকে সিরিজটি অত্যন্ত শক্তিশালী। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আগমবাগীশ হিসেবে যথারীতি অনবদ্য। তাঁর হাঁটাচলা, বাচনভঙ্গি চরিত্রটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। অর্জুন চক্রবর্তী দ্বৈত চরিত্রে (স্যমন্তক ও বজ্রকেতু) নিজের স্মার্টনেস আর নিষ্ঠুরতার ভারসাম্য চমৎকার বজায় রেখেছেন। মোহনা মাইতিকেও তিতলি হিসেবে বেশ বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। তবে কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা রজত গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বলিষ্ঠ অভিনেতাদের মাত্র দু-তিনটি দৃশ্যে ব্যবহার করাটা কিছুটা অপচয় মনে হয়েছে।

কেন হতাশ হলো দর্শক?
সিরিজটির বড় দুর্বলতা এর চিত্রনাট্যের বুনোট। অভীক সরকারের মূল গল্পের যে অডিও স্টোরি অত্যন্ত জনপ্রিয়, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার শান্তনু মিত্র নিয়োগী সেখান থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। এই ‘স্বাধীন পথে’ হাঁটাটাই কাল হয়েছে। তিনটে টাইমলাইন সামলাতে গিয়ে সিরিজের শেষ দিকটা বড্ড ‘জগাখিচুড়ি’ হয়ে গিয়েছে। আগমবাগীশের হঠাৎ হঠাৎ আবির্ভাব কিংবা গল্পের ক্লাইম্যাক্সের দিকে হুড়মুড় করে এগিয়ে যাওয়া দর্শকদের মনে অনেক প্রশ্ন রেখে দেয়। তিতলির মতো আধুনিক মেয়ের স্রেফ ফেসবুকের পরিচয়ে দুই বোনকে নিয়ে ঘর ছাড়াটাও যুক্তির বিচারে বেশ দুর্বল।

পরিশেষে বলা যায়, বাস্তব জগতের নারীপাচার আর ইতিহাসের তন্ত্রসাধনাকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও তার বাস্তবায়ন আরও সংহত হতে পারত। তবে আপনি যদি মূল গল্প না পড়ে থাকেন এবং লজিক সরিয়ে রেখে কেবল টানটান অভিনয় আর রহস্য উপভোগ করতে চান, তবে ‘রক্তফলক’ একবার দেখে নিতেই পারেন।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy