সত্তরের দশকের বলিউড মানেই ছিল শাড়ি আর ঐতিহ্যের মিশেল। সেই চেনা ছক ভেঙে ঝড়ের মতো পর্দায় আবির্ভূত হয়েছিলেন পারভিন ববি। জিনস, লম্বা খোলা চুল আর বোল্ড লুকে তিনি নিমেষেই বদলে দিয়েছিলেন ভারতীয় সিনেমার সংজ্ঞাকে। কিন্তু রুপোলি পর্দার সেই মোহময়ী হাসির আড়ালে যে কতটা একাকীত্ব আর অন্ধকার লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো পারভিন নিজেও আগে বুঝতে পারেননি।
জুনাগড়ের আভিজাত্য থেকে বিটাউনের রানি
জুনাগড়ের এক অভিজাত বংশের মেয়ে পারভিন ববি। পড়াশোনা চলাকালীনই এক পরিচালকের নজরে পড়া এবং তারপর সোজা লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের দুনিয়ায়। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল সেই সময়ের ‘সুপারহিট’ ফর্মুলা। ‘দিওয়ার’ থেকে ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’— একের পর এক সফল ছবি তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল খ্যাতির শিখরে।
প্রেমের গোলকধাঁধা ও মানসিক ক্ষত
পারভিনের ক্যারিয়ার যতটা সফল ছিল, ব্যক্তিগত জীবন ছিল ততটাই অগোছালো। ড্যানি ডেনজংপা, কবীর বেদী এবং মহেশ ভাট— তাঁর জীবনের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কই ছিল টালমাটাল। প্রত্যেকেই বিবাহিত হওয়ায় পারভিন শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী ঠিকানা পাননি। বারবার বিচ্ছেদ তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। আশির দশকের শুরু থেকেই তিনি ‘প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া’ নামক এক কঠিন মানসিক রোগে আক্রান্ত হন।
আতঙ্ক আর নিঃসঙ্গতার বন্দিদশা
অসুস্থতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তিনি সবসময় আতঙ্কে থাকতেন কেউ তাঁকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে। খ্যাতির তুঙ্গে থাকাকালীন ১০ বছর নিখোঁজ থাকার পর যখন মুম্বই ফেরেন, তখন চেনার উপায় ছিল না সেই মোহময়ী নায়িকাকে। তিনি দাবি করতে শুরু করেন যে, অমিতাভ বচ্চন এবং বিল ক্লিনটন তাঁকে মারার ষড়যন্ত্র করছেন। এমনকি নিজের ঘরের সিলিংয়ে ক্যামেরা লুকানো আছে ভেবে নিজেকে জুহুর এক ফ্ল্যাটে বন্দি করে ফেলেন তিনি।
এক মর্মান্তিক বিদায়
২০০৫ সালের ২০ জানুয়ারি। জুহুর ফ্ল্যাটের বাইরে তিনদিন ধরে দুধের প্যাকেট আর খবরের কাগজ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ ডাকা হয়। দরজা ভেঙে উদ্ধার হয় এক সময়ের ‘ড্রিম গার্ল’-এর নিথর দেহ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পারভিনের পেটে শেষ কয়েকদিন এক দানা খাবারও ছিল না। সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তাঁর দেহ নেওয়ার জন্য পরিবারের কেউ আসেনি। অবশেষে পুরনো প্রেমিক মহেশ ভাট তাঁর শেষকৃত্যের দায়িত্ব নেন। কোটি মানুষের হৃদয়ে রাজ করা রানির প্রস্থান হলো চরম নিঃসঙ্গতায়।





