‘মায়ের ওই অবস্থা ফেলে কেন শুটিং করব?’ মাত্র ১৯ বছর বয়সে কোন চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন সঞ্জু বাবা?

বলিউডের জনপ্রিয় তারকা সঞ্জয় দত্তের জীবন মানেই যেন টানটান উত্তেজনায় ভরপুর এক সিনেমা। তবে তাঁর জীবনের শুরুর অধ্যায়টি ছিল চরম ট্র্যাজেডি এবং হৃদয়বিদারক এক বাস্তবতায় মোড়া। সম্প্রতি এআইজি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. ডি নাগেশ্বর রেড্ডির সঙ্গে একটি খোলামেলা কথোপকথনে অভিনেতা তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলোর কথা ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৯ বা ২০ বছর, ঠিক সেই সময়ে তাঁর জীবনে বয়ে গিয়েছিল এক মারাত্মক ঝড়। একদিকে বড় পর্দায় তাঁর প্রথম ছবি ‘রকি’ মুক্তির সমস্ত প্রস্তুতি চলছে, আর অন্যদিকে মারণ ক্যানসারের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তাঁর মা তথা কিংবদন্তি অভিনেত্রী নার্গিস।
আশির দশকের সেই সময়টায় ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসা বর্তমান যুগের মতো এত উন্নত ছিল না। চিকিৎসার জন্য নার্গিসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্লোয়ান কেটারিং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁর একটি দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলেও তাঁর শরীরে একের পর এক মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে। চিকিৎসকদের সমস্ত নিরলস প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে গভীর কোমায় চলে যান। বিদেশের মাটিতে মা যখন মৃত্যুযন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ভারতে আটকে ছিল সঞ্জয়ের অভিষেক ছবি ‘রকি’-র ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ।
এমন এক গভীর সঙ্কটে বাবা তথা বর্ষীয়ান ও কিংবদন্তি অভিনেতা সুনীল দত্ত এক অত্যন্ত কঠিন এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তরুণ সঞ্জয়কে জোর করে ভারতে ফেরত পাঠান, যাতে তিনি ছবির বাকি থাকা শুটিং দ্রুত শেষ করতে পারেন। সেই বিভীষিকাময় অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে সঞ্জয় আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “মা হাসপাতালে কোমায় শুয়ে আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন, আর আমাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে শুটিং করতে হবে! সেই অল্প বয়সে বাবার এই কড়া নির্দেশ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। মায়ের ওই চরম অবস্থা ছেড়ে কেন আমাকে ছবির কাজ শেষ করতে হবে, তা আমার তরুণ মনে কোনোভাবেই ঢুকছিল না। আমি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম। তবে বাবার কথা অমান্য করার উপায় ছিল না, তাই বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে এসে কাজ শেষ করেছিলাম।”
অভিনেতা আরও জানান যে, তাঁর মা নার্গিসের মধ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকার এক অবিশ্বাস্য ও প্রবল তাগিদ কাজ করছিল। তিনি যেন কেবল নিজ দেশে একবার ফিরে আসার জন্যই মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ভারতে পা রাখার পরই যেন তাঁর সেই অদম্য লড়াইয়ের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। দেশে ফেরার ঠিক কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কেবল শুটিং চালিয়ে যাওয়ার মানসিক যন্ত্রণা নয়, মায়ের জীবন বাঁচাতে সেই বয়সেই সঞ্জয় এবং তাঁর দুই ছোট বোন নিজেদের শরীর থেকে রক্ত ও প্লেটলেট দান করেছিলেন। সেই পুরো সময়টাকে সঞ্জয় তাঁর জীবনের অন্যতম গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে এত সব মানসিক যন্ত্রণা ও বিপদের মাঝেও বাবা সুনীল দত্তের কঠোর অনুশাসনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সঞ্জয়। তিনি জানান, বাবা অত্যন্ত কড়া মেজাজের মানুষ হলেও বড়দের সম্মান করা এবং সমাজের প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা জানানোর যে নিখাদ শিক্ষা তিনি তাঁকে দিয়েছিলেন, তা তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথপ্রদর্শক হয়ে আজও তাঁর সঙ্গে রয়ে গেছে।