পরলোকগত ইউরোপের প্রবীণতম রাজা! ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত নরওয়ের পঞ্চম হ্যারাল্ড

ইউরোপের রাজনীতির আঙিনা ও রাজপরিবারের ইতিহাসে এক যুগের অবসান ঘটাল মর্মান্তিক এক সংবাদ। জীবনের ৮৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন নরওয়ের জনপ্রিয় রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড। স্থানীয় সময় অনুযায়ী শুক্রবার সকাল ৬:৩৫ মিনিটে অসলোর ন্যাশনাল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে নরওয়ে শাসন করা হ্যারাল্ড ছিলেন বর্তমান ইউরোপের প্রবীণতম শাসক। বয়স ও স্মৃতিভ্রংশ জনিত নানা শারীরিক জটিলতা সত্ত্বেও তিনি ইউরোপের অন্য রাজাদের মতো স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেননি, বরং মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁর এই প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা দেশে।

১৯৩৭ সালে অসলোর নিকটবর্তী আস্কারে জন্মগ্রহণ করা হ্যারাল্ডের জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী নরওয়ে দখল করলে মাত্র তিন বছর বয়সে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। মায়ের হাত ধরে প্রথমে সুইডেন এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় হোয়াইট হাউসে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৫ সালে তিনি নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। নরওয়েজীয় মিলিটারি কলেজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করার পর বাবার মতো তাঁরও সমুদ্র এবং পালতোলা নৌকার প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তিনি একাধিক অলিম্পিকে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি ১৯৮৭ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন।

রাজতন্ত্রকে আধুনিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং রোমাঞ্চকর প্রেমের গল্প আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের রাজপরিবারগুলোর প্রথা ভেঙে তিনি দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একাধিক রাজকন্যার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি মন দিয়েছিলেন এক সাধারণ ব্যবসায়ীর কন্যা তথা নিজের স্কুলজীবনের প্রেমিকা সোনিয়া হ্যারাল্ডসেনকে। প্রথমে তাঁর বাবা রাজা ওলাভ এই সম্পর্কের তীব্র বিরোধী হলেও ছেলের অটল জেদের কাছে অবশেষে হার মানেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ আগস্ট তাঁদের ঐতিহাসিক বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ মানুষ সোনিয়াকে রানি হিসেবে সাদরে গ্রহণ করে।

এদিকে পঞ্চম হ্যারাল্ডের প্রয়াণের পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র অষ্টম হাকন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নরওয়ের নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে আসীন হচ্ছেন। উল্লেখ্য, নরওয়ের রাজপরিবারের ভূমিকা মূলত প্রতীকী এবং আনুষ্ঠানিক হলেও ৫৫ লক্ষ মানুষের এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রকৃত প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদের হাতেই ন্যস্ত থাকে। হ্যারাল্ডের দীর্ঘ রাজত্বকালে তেল ও গ্যাস শিল্পের হাত ধরে নরওয়ে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। রাজপ্রাসাদের কঠোর প্রথা ভেঙে প্রেমের জয়যাত্রা এবং জনমুখী শাসনের জন্য পঞ্চম হ্যারাল্ড বিশ্ববাসীর হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।