দত্তক নেওয়ার সত্যিটা জানতে পেরে কেন ভেঙে পড়েছিলেন ভারতের প্রথম সুপারস্টার রাজেশ খন্না?

বলিউড তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরসবুজ ও অমর এক নাম রাজেশ খন্না। রূপোলি পর্দায় যাঁর এক আঙুলের ইশারায় কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে ঝড় উঠত, যাঁর ক্যারিশ্মা এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে আজও চর্চা থামেনি, সেই মানুষটির ব্যক্তিগত জীবন ছিল তীব্র যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা এবং একাধিক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে ভরপুর। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অভিনেতা রাজেশ খন্নাকে নিয়ে বহু অজানা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন অনিতা আডবাণী। তিনি জানিয়েছেন, সুপারস্টার হওয়ার নেপথ্যে যে মানসিক লড়াই এবং অবিশ্বাসের পাহাড় রাজেশ খন্নাকে কুড়ে কুড়ে খেত, তা জানলে যেকোনো মানুষের বুক কেঁপে উঠবে। ব্যক্তিগত জীবনের চরম আঘাতগুলো কীভাবে তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল, তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন চর্চা।
অনিতা আডবাণীর প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, রাজেশ খন্না যখন জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছিলেন, সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে জানতে পারেন যে তিনি তাঁর বাবা-মায়ের জৈবিক সন্তান নন, বরং তাঁকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। এই সত্যটি তাঁর কাছে এক বিশাল মানসিক ধাক্কা হিসেবে এসেছিল। শৈশব বা কৈশোরে নয়, বরং বেশ কিছুটা বড় হওয়ার পর হঠাৎ করেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন ‘কাকাবাবু’। অনিতা জানিয়েছেন, পারিবারিক এক সফরে তাঁর এক বোন বাড়িতে এসে সোজাসুজি প্রশ্ন করে বসেন যে এই ছেলেটি কে? ঠিক সেই মুহূর্তেই সবার সামনে এই সত্য উন্মোচিত হয় যে রাজেশ খন্না দত্তক পুত্র। নিজের জন্মপরিচয়ের এই আকস্মিক সত্য উন্মোচন তাঁকে আমৃত্যু তাড়া করে বেড়িয়েছিল।
নিজের জন্মপরিচয় জানার এই চরম মানসিক অভিঘাতের পাশাপাশি একাধিক ব্যর্থ সম্পর্ক এবং কাছের মানুষদের প্রতারণা রাজেশ খন্নাকে ভীষণভাবে গুটিয়ে নিয়েছিল। অনিতার দাবি অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কাউকে সহজে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে পারতেন না। এমনকি পেশাগত জীবনে তুঙ্গে থাকার সময় যখন তিনি রাজনৈতিক প্রচারে অংশ নিতেন, তখন তিনি কখনই কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা পারিশ্রমিক নিতেন না। টাকা-পয়সার হিসাব বা লেনদেনের থেকে বরাবর নিজেকে দূরে রাখতেন তিনি। অথচ ব্যক্তিগত জীবনের এই গভীর ক্ষত ও একাকীত্ব সত্ত্বেও তিনি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন, তখন সমস্ত যন্ত্রণা আড়ালে রেখে সম্পূর্ণ সাবলীলভাবে রূপোলি পর্দায় চরিত্র ফুটিয়ে তুলতেন, যা সত্যিই এক অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির পরিচায়ক।
১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্লকবাস্টার ছবি ‘আরাধনা’র হাত ধরে রাতারাতি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের প্রথম মেগাস্টার বা সুপারস্টার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন রাজেশ খন্না। এরপর বক্স অফিসে তাঁর ম্যাজিক এমন চরম আকার ধারণ করেছিল যে পরপর ১৫টি সুপারহিট ছবি উপহার দিয়ে তিনি সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। সেই স্বর্ণযুগে তাঁকে নিজেদের ছবিতে কাস্ট করার জন্য নামী-দামী প্রযোজক ও পরিচালকরা তাঁর বাড়ির বাইরে লাই দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু সময়ের নির্মম নিয়মে ছবি বদলাতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অমিতাভ বচ্চন যখন বলিউডের মূল স্রোতে প্রবেশ করে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে শুরু করেন, তখন ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে রাজেশ খন্নার স্টারডম। দর্শকরা আর তাঁর গতানুগতিক রোম্যান্টিক ঘরানার ছবি গ্রহণ করতে চাইছিলেন না। একের পর এক সিনেমা বক্স অফিসে ব্যর্থ হতে শুরু করে। কেরিয়ারের এই মারাত্মক পতন এবং আকস্মিক জনপ্রিয়তাহীনতা কিংবদন্তি এই অভিনেতাকে মানসিকভাবে চরম হতাশার মুখে ঠেলে দিয়েছিল।