ভবানীপুর আর ময়রা স্ট্রিট—মহানায়ক উত্তম কুমারের জীবনটা যেন এই দুই মেরুতেই থমকে ছিল চিরকাল। প্রতি রবিবার তিনি ফিরে যেতেন ভবানীপুরের পৈতৃক ভিটেয়, মা আর স্ত্রী গৌরী দেবীর কাছে। সেখানেই কাটত তাঁর পারিবারিক কিছু একান্ত মুহূর্ত। মহানায়কের জীবনের টানাপোড়েন আর সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে, কিন্তু তাঁর অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা এক অসহায় যোদ্ধার ছবি সম্প্রতি ফুটে উঠেছে একটি ব্যক্তিগত চিঠির মাধ্যমে।
উত্তম কুমার তখন বম্বের (বর্তমানে মুম্বই) মায়ানগরীতে নিজের ভাগ্য অন্বেষণ করছেন। কলকাতায় তখন তাঁকে ঘিরে হাজারো গুঞ্জন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে উত্তাল টলিউড। এদিকে স্ত্রী গৌরী দেবী স্বামীর সঙ্গে মুম্বইয়ে সংসার পাতার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মহানায়ক জানতেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাৎ। স্ত্রীর সেই আবেগপ্রবণ আবদার আর মুম্বইয়ের কঠিন জীবনযুদ্ধের চাপে পড়ে তিনি একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন তাঁর প্রিয় ‘গজু’কে। উল্লেখ্য, স্ত্রীকে ভালোবেসে এই নামেই ডাকতেন তিনি।
চিঠির প্রতিটি ছত্রে ধরা পড়েছে এক বিষণ্ণ মহানায়ককে, যাঁকে আমরা রূপোলি পর্দায় দেখতে অভ্যস্ত নই। তিনি লিখেছিলেন, “মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক। ভেবেছিলাম তোমাকে এনে রাখার জন্য দুটো ঘরের একটা ফ্ল্যাট নেব। কিন্তু হাতে যদি টাকাই না আসে, তবে কার ভরসায় ফ্ল্যাট ভাড়া করব? আর আমিই বা না খেয়ে কতদিন এখানে পড়ে থাকব?” সেই সময় মুম্বইয়ে একটি সাধারণ ফ্ল্যাটের ভাড়া ছিল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই অঙ্কটি সামান্য মনে হলেও, সেই সময় মহানায়কের কাছে এটি ছিল এক আকাশছোঁয়া বিলাসিতা। বাজারের দেনা আর রোজকার লড়াইয়ে তিনি তখন রীতিমতো কোণঠাসা।
চিঠির শেষ অংশে ফুটে উঠেছিল গৌরী দেবীর প্রতি তাঁর গভীর মমতা আর আকুতি। কলকাতায় চলা নানা মুখরোচক গল্প থেকে স্ত্রীকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। মহানায়ক লিখেছিলেন, “আমার জন্য তো অনেক কষ্টই সহ্য করেছ, আর কটা দিন একটু সহ্য করো… ভালো থেকো, ভালোবাসা নিও।” মুম্বইয়ে নতুন সংসার পাতার সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফিরতে হয়েছিল প্রিয় কলকাতায়। সুপ্রিয়া দেবী আর গৌরী দেবীর মাঝখানের সেই চিরস্থায়ী দোটানা তাঁর জীবনের ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে গিয়েছিল আজীবন।