কলকাতা শহরের বুকে শিল্পানুরাগীদের জন্য এক নতুন ঠিকানার নাম হয়ে উঠেছে ‘কাইরোজ’। গত ১ থেকে ৩ জুন গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় আয়োজিত তিনদিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীতে মানুষের ঢল প্রমাণ করে দিল, ডিজিটাল রিল আর কনটেন্টের জমানাতেও শিল্পরসিকরা ক্যানভাসের জাদুতে আজও মন্ত্রমুগ্ধ। চিত্রশিল্পী সঙ্গীতা বিশ্বাসের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘কাইরোজ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে ৩০ জন শিল্পীর ৫০টি অনবদ্য ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ২৫ জন শিল্পীকে নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিল ‘কাইরোজ’। গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালাতেই অনুষ্ঠিত সেই প্রথম প্রদর্শনী সাফল্যের মুখ দেখার পর, এবার দ্বিতীয়বার আরও বড় পরিসরে ফিরে এসেছে তারা। এ বছরের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল। ১ জুন বিকেলে ফিতে কেটে প্রদর্শনীটির সূচনার সময় তরুণ শিল্পীদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, “শিল্প নিয়ে বাঁচতে হবে।” এই অমূল্য বাণীই এখন কাইরোজের প্রতিটি সদস্যের কাছে এক বিশেষ অনুপ্রেরণা।
কী বিশেষত্ব ছিল এই প্রদর্শনীতে? শিল্পী সঙ্গীতা বিশ্বাস জানালেন, নির্দিষ্ট কোনো থিম না থাকলেও, কনসেপচুয়াল, হাইপার-রিয়েলিস্টিক গ্রাফাইট থেকে শুরু করে পৌরাণিক—নানা ধরনের কাজ এক ছাদের নিচে দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শকরা। কেন এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘কাইরোজ’? সঙ্গীতার ব্যাখ্যা, এটি একটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ। ‘ক্রোনস’ (Kronos) মানে গতানুগতিক সময়, কিন্তু ‘কাইরোজ’ (KAIROS) হলো সেই সুবর্ণ মুহূর্ত, যখন সুযোগ ও প্রস্তুতি এক বিন্দুতে মিলিত হয়। একজন শিল্পীর জীবনে এটি তখনই আসে যখন তুলি আর ক্যানভাসের মাঝে কোনো দূরত্ব থাকে না।
চাকরির বাজারের গতানুগতিক ছক ভেঙে সঙ্গীতার এই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী হয়েও কেন তুলি ধরলেন? হাসিমুখে সঙ্গীতা বলেন, “অন্যদের হাতেখড়ি হয় পেন্সিল দিয়ে ‘অ-আ’ লিখে, আমার হয়েছিল ছবি এঁকে। মায়ের কাছ থেকেই প্রথম পাঠ নেওয়া।” বর্তমানে তিনি একটি আর্ট স্কুলের পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবেও কাজ করছেন। অ্যাক্রিলিক ও তেল রং তাঁর সবচেয়ে পছন্দের মাধ্যম। ডোনাল্ড জোলান, ভ্যান গগ, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি থেকে শুরু করে এম এফ হোসেন ও বিকাশ ভট্টাচার্যের সৃষ্টি তাঁকে প্রতিনিয়ত প্রেরণা জোগায়।
প্রদর্শনীর সাড়াশব্দ নিয়ে উচ্ছ্বসিত সঙ্গীতা জানান, প্রথম দিন থেকেই মানুষের অভাবনীয় সাড়া মিলেছে। হাতে আঁকা ছোট ছোট স্মারক দর্শকদের মন জয় করেছে, আর সংগ্রাহকদের ইতিবাচক আগ্রহ প্রদর্শনীর সাফল্যকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট থিম নিয়ে আরও বড় আঙ্গিকে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। ‘কাইরোজ’ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি এখন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক উজ্জ্বল স্বপ্নের প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।





