হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা খিটখিটে মেজাজ? এই ১০টি লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন শরীরে বাসা বেঁধেছে মারাত্মক রোগ

শরীর ভেতর থেকে শুকিয়ে যাচ্ছিল, সারাক্ষণ ঘিরে ধরত অদ্ভুত ক্লান্তি আর অবসাদ। কিন্তু কারণ বুঝতে পারেননি ঢাকার আফরোজা আক্তার। অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়েই চোখ কপালে উঠল তাঁর—জানা গেল, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে ডায়াবেটিস!
আফরোজা একা নন, দেশের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞদের চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ঘুণাক্ষরেও টের পান না যে তাঁরা এই মারণরোগে আক্রান্ত। অন্য কোনো রোগের রুটিন চেকআপ বা পরীক্ষা করাতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে ধরা পড়ে এই রোগ।
দেশের ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত: বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ. কে. আজাদ খান জানিয়েছেন, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এখনও মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট)-এর একটি সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে দেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি দশ লক্ষ! এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সি তরুণের সংখ্যা ২৬ লক্ষ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা ৮৪ লক্ষ।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ স্পষ্ট ভাষায় জানান, যাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকে, তাঁরা প্রথমদিকে এই রোগের উপস্থিতি টের পান না। ডায়াবেটিস হলো একধরণের ‘ধীরগতির ঘাতক’ (Silent Killer), যা আকস্মিক বিপদে ফেল না দিলেও ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে কুরে কুরে খায়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস অশনাক্ত থাকলে বা চিকিৎসা না করালে কিডনি, লিভার, চোখ এবং ত্বক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, চুল পড়ে যায় এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
কোন কোন লক্ষণ দেখলে সাবধান হবেন? ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলি অনেক সময়ই সাধারণ ক্লান্তি বলে ভুল হয়। তবে চিকিৎসকরা নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন—
ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া ও মাত্রাতিরিক্ত পিপাসা লাগা
সারাক্ষণ দুর্বল লাগা বা ঘোর ঘোর ভাব আসা
ক্ষুধা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া
মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হওয়া
কোনো আপাত কারণ ছাড়াই শরীরের ওজন হু হু করে কমে যাওয়া
শরীরে ছোটখাটো ক্ষত বা কাটাছেঁড়া দীর্ঘদিনেও না শুকানো
চামড়া শুষ্ক, খসখসে হয়ে যাওয়া ও অতিরিক্ত চুলকানি ভাব
খিটখিটে মেজাজ ও অতিরিক্ত বিরক্তি ভাব
চোখে ঝাপসা বা কম দেখতে শুরু করা
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি? বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মা, ভাই-বোন বা রক্তসম্পর্কিত নিকটাত্মীয়দের ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া যাঁরা নিয়মিত হাঁটেন না, কায়িক পরিশ্রম করেন না বা অত্যন্ত অলস জীবনযাপন করেন, তাঁরা সহজেই এর শিকার হন। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকা ব্যক্তি এবং অতিরিক্ত ওজনের শিশুদেরও এই রোগ হানা দিতে পারে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই যদি আগেভাগে সতর্ক হওয়া যায়, নিয়ম করে প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার কদম হাঁটা হয় এবং খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আনা যায়, তবে এই রোগ দূরে রাখা সম্ভব। তবে একবার ডায়াবেটিস হয়ে গেলে তা পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না।
করণীয় কী? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে বা যাঁদের ঝুঁকির মাত্রা বেশি, তাঁরা অবশ্যই বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করাবেন। এর জন্য সবসময় বড় হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আজকাল অধিকাংশ ফার্মেসিতেই স্বল্পমূল্যে দ্রুত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা যায়। যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, ততই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।