১১ বছর পর চালু হতেই কেলেঙ্কারি! ৯টি লেন মিশল ৩ লেনে, দিল্লির মেগা ফ্লাইওভারে কেন এমন ট্র্যাফিক বিপর্যয়?

দীর্ঘ ১১ বছরের দীর্ঘ প্রতিক্ষা ও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পর গত ২৯ সেপ্টেম্বর মহা সমারোহে উদ্বোধন করা হয়েছিল দিল্লির বহুচর্চিত বারাপুল্লা ফেজ-৩ এলিভেটেড করিডোর। আশা ছিল, সরাই কালে খান, ময়ূর বিহার কিংবা নয়ডাগামী হাজার হাজার নিত্যযাত্রীর যানজটের যন্ত্রণা চিরতরে মিটে যাবে। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর জনসাধারণের জন্য পথটি খুলে দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই উল্টো ট্র্যাফিক বিপর্যয়ে নাভিশ্বাস উঠছে আমজনতার। নগর পরিকল্পনাবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ চালক—সবার মুখে এখন একটাই প্রশ্ন, যানজট কমানোর জন্য বানানো ফ্ল্যাগশিপ উড়ালপুল নিজেই কেন আস্ত ট্র্যাফিক জ্যামের কেন্দ্রে পরিণত হলো?

টিভি৯ ভারতবর্ষের সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই মেগা প্রকল্পের মারাত্মক কিছু অব্যবস্থাপনা ও নকশাগত ত্রুটি। নিচে ১১টি সহজ পয়েন্টে তুলে ধরা হলো বারাপুল্লা ফেজ-৩-এর আসল সমস্যাগুলো:

১. যানজট কমানোর ফ্লাইওভারেই দীর্ঘ গাড়ির সারি ময়ূর বিহার ফেজ-১ থেকে বারাপুল্লা ফেজ-৩-এ ওঠার ঠিক ৫০০ মিটারের মধ্যেই চাকার গতি থমকে যাচ্ছে। দ্রুত যাতায়াতের যে সুড়ঙ্গ পথ হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে সারি সারি গাড়ি।

২. ৯টি লেন হঠাৎ মিশে যাচ্ছে মাত্র ৩টি লেনে! সবচেয়ে বড় নকশাগত গলদ হলো ট্র্যাফিক একত্রীকরণ বা ‘বটলনেক’। বিভিন্ন দিক থেকে আসা প্রায় ৯টি আলাদা লেনের ট্র্যাফিক ফ্লাইওভারে উঠে মাত্র ৩টি লেনে গিয়ে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে পাইপের মাথায় জল আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

৩. একসঙ্গে ৭৫ হাজার যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ হিসেব ছাড়াই হঠাৎ ট্র্যাফিকের আগমন ঘটেছে এই করিডোরে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭৫ হাজারেরও বেশি যানবাহন এই উড়ালপুলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করছে, যা সামলানোর পরিকাঠামো এই নকশায় অনুপস্থিত।

৪. বিভ্রান্তিকর সাইনবোর্ড ও দিক নির্দেশনার অভাব ফ্লাইওভারে ওঠার আগে ড্রাইভারদের পথ দেখানোর মতো সঠিক দিক নির্দেশক বা ‘সাইনেজ’ রাখা হয়নি। এর ফলে হঠাৎ ডান বা বামে বাঁক নিতে গিয়ে চালকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো লেনের গতি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।

৫. ময়ূর বিহার ফেজ-১ রামপুর ফাইওভারের মারাত্মক ফানেল এফেক্ট ময়ূর বিহার থেকে আসা গাড়িগুলো যখন মূল উড়ালপুলে যুক্ত হচ্ছে, তখন কোনো ‘মার্জিং লেন’ না থাকায় সরাসরি চাপ পড়ছে চলমান ট্র্যাফিকের ওপর।

৬. নগর পরিকল্পনাবিদদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি প্রখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ এ কে জৈন স্বীকার করেছেন যে, এই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ ট্র্যাফিকের আনুমানিক হিসেব এবং প্রকৌশল নকশায় বড় ধরনের গাফিলতি বা ত্রুটি থেকে গিয়ে থাকতে পারে।

৭. হঠাৎ লেন কমে যাওয়ার জায়গায় মারাত্মক দুর্ঘটনা-প্রবণ অঞ্চল যেখানে ৯টি লেন সংকুচিত হয়ে ৩টি লেনে রূপ নিচ্ছে, সেখানে ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তনের চক্করে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা বা গাড়ির ঘষাঘষি লেগেই রয়েছে।

৮. অপর্যাপ্ত পুলিশি নজরদারি ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা নতুন খোলা এই মেগা করিডোরে যে ধরনের সজাগ ও সার্বক্ষণিক ট্র্যাফিক পুলিস মোতায়েন থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তেমন কোনো কার্যকর পরিচালনা চোখে পড়ছে না।

৯. পিক আওয়ারে নয়ডা ও সরাই কালে খান পুরো স্তব্ধ সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে (Peak Hours) নয়ডা ও দিল্লির অন্যান্য সীমান্ত এলাকা থেকে আসা চালকদের এই একটা বোতলবন্দি জায়গাতেই ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট অতিরিক্ত অপচয় করতে হচ্ছে।

১০. জরুরি পরিষেবার গাড়ি আটকে পড়ার আশঙ্কা ফ্লাইওভারের সংকীর্ণ নকশা এবং থমকে থাকা ট্র্যাফিকের কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার মতো কোনো নির্দিষ্ট ‘ইমার্জেন্সি লেন’ রাখা হয়নি।

১১. দীর্ঘস্থায়ী সমাধান না করলে গণ-অসন্তোষের সম্ভাবনা বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এই প্রকল্প দ্রুত পুনর্নকশা বা কার্যকর ট্র্যাফিক ব্যবস্থার আওতায় না আনলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষোভ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।