দার্জিলিংয়ের অহংকার রেড পান্ডার বংশবৃদ্ধি নিয়ে বড় সঙ্কট! বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে কোন সমস্যার কথা জানাল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ?

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং রেড পান্ডা প্রজননের অন্যতম সেরা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড়ি চিড়িয়াখানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও, বর্তমানে এখানে রেড পান্ডার স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ও বয়সভিত্তিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। গত তিন বছরে প্রায় ১০টি নতুন শাবকের জন্ম হলেও, প্রজনন প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক শ্লথগতি গবেষক ও বনকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

বর্তমানে দার্জিলিং চিড়িয়াখানায় মোট ২০টি রেড পান্ডা রয়েছে— যার মধ্যে ৭টি পুরুষ এবং ১৩টি মহিলা। তবে প্রজননের ক্ষেত্রে মূলত দুটি বড় সঙ্কট মাথাচাড়া দিয়েছে: প্রথমটি হলো বয়স এবং দ্বিতীয়টি হলো মানসিক সামঞ্জস্য। চিড়িয়াখানার বেশ কিছু পান্ডার বয়স বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রজনন ক্ষমতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৬ বছর বয়সি ‘কর্মা’ কিংবা ১৩ বছর বয়সি ‘কিটচি’-র মতো বয়স্ক পান্ডারা প্রজনন বয়সের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় তাদের থেকে নতুন শাবকের জন্ম হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, তরুণ ও প্রজননে সক্ষম পান্ডাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে অন্য সমস্যা। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, জোড় বাঁধার সময় পুরুষ ও মাদি পান্ডাদের মধ্যে পারস্পরিক পছন্দ বা মানসিক মিল না থাকলে তারা মিলনে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করছে না, যার ফলে নতুন শাবক আসার গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, দার্জিলিং চিড়িয়াখানার এই সফল প্রজনন কর্মসূচির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অতীতে এই সাফল্যের সুবাদেই সিঙ্গালীলা ও নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে ‘ওয়াইল্ড রিলিজ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে রেড পান্ডা পুনর্বাসন সম্ভব হয়েছিল। গ্লোবাল স্পিসিজ ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (GSMP)-এর অধীনে নিউজিল্যান্ড বা সাইপ্রাসের মতো আন্তর্জাতিক চিড়িয়াখানাতেও এখান থেকে সুস্থ রেড পান্ডা পাঠানো হয়েছে। এমনকি জিনের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে নেদারল্যান্ডস থেকেও নতুন পুরুষ রেড পান্ডা আনা হয়েছিল। প্রজনন গতি কমে গেলে ভবিষ্যতে এই আন্তর্জাতিক আদান-প্রদান এবং জিনগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটিই বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।

এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানভিত্তিক বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। চিড়িয়াখানার পশু বিশেষজ্ঞ জয় দে জানিয়েছেন, বর্তমানে ‘জেনেটিক স্টাডি’ ও আচরণগত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পান্ডাদের নিখুঁত জোড় নির্বাচনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পান্ডাদের মানসিক চাপ কমাতে এবং প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে তাদের আবাসন ও খাদ্যাভ্যাসেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় বাঁশ পাতার পাশাপাশি আপেল, আঙুর, কলা ও আনারসের মতো তাজা ফল এবং পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে ডিম ও দুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের গবেষক ও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই পাহাড়ি প্রাণীদের ভবিষ্যৎ ঐতিহ্য ও বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে এখন রাতদিন এক করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যান কর্তৃপক্ষ।