“ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সেজে প্র্যাকটিস!”-গ্রেফতার ভুয়ো চিকিৎসক, প্রশ্নের মুখে মেডিক্যাল কাউন্সিল

রাজ্যে ফের ভুয়ো চিকিৎসকের পর্দাফাঁস। এবার ঘটনাস্থল দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর। নিজেকে প্রখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বা ‘অঙ্কোলজিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করার অভিযোগে সোমবার রাতে ঘাসিয়াড়া এলাকা থেকে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রের খবর, অভিযুক্ত ব্যক্তি এমবিবিএস (MBBS) এবং এফআরসিএস (FRCS)-এর মতো একাধিক সম্মানজনক ও উচ্চশিক্ষার ভুয়ো ডিগ্রি ব্যবহার করতেন। তাঁর ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। উপযুক্ত নথিপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষমেশ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ইতিমধ্যেই এই চক্রের শিকড় কতদূর তা জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ।

মেডিক্যাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

রাজ্যে একের পর এক ভুয়ো চিকিৎসকের খোঁজ মেলায় চিকিৎসা জগতে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বেশ কয়েকটি চিকিৎসক সংগঠনের অভিযোগ, বিগত ১৫ বছর ধরে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের অন্দরে একশ্রেণির অসাধু সদস্য উৎকোচের বিনিময়ে বেআইনিভাবে রেজিস্ট্রেশন ও ভুয়ো ডিগ্রি সার্টিফিকেট বিলি করেছে। সেই সমস্ত জাল নথিপত্র সম্বলিত ডিগ্রি নিয়েই ভুয়ো চিকিৎসকরা শহর থেকে শুরু করে মফস্বলে নির্দ্বিধায় রোগী দেখে বেড়াচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল আমলের মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং সেখান থেকে দেওয়া সমস্ত রেজিস্ট্রেশনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে একাধিক চিকিৎসক সংগঠন।

সরব বিরোধী ও চিকিৎসক নেতৃত্ব

ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। শাসকদলের নীতি ও মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিজেপি ডক্টর্স ফোরামের নেতা ড. তন্ময় মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। ২০১৭ সালেও প্রায় ৫০০ জন ভুয়ো চিকিৎসকের নাম সিআইডি তদন্তে উঠেছিল এবং কলকাতার বড় নামীদামি বেসরকারি হাসপাতালেও তাদের প্র্যাকটিস করার প্রমাণ মেলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়েছে কি না তা পরিষ্কার নয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের ভোটে অনিয়মের মাধ্যমে কাউন্সিলে জায়গা করে নিয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। ড. মুখোপাধ্যায়ের দাবি, মেডিক্যাল কাউন্সিলের বর্তমান সভাপতির অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত এবং প্রতিটি ভুয়ো ডাক্তারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক ড. উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন, “গত দেড় দশক ধরে এই ভুয়ো চক্রটি সক্রিয়। হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড থেকে শুরু করে সর্বত্র এদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। আমাদের আশঙ্কা, রাজ্যে ভুয়ো চিকিৎসকের সংখ্যা এখন কয়েক গুণে দাঁড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমাদের আবেদন, শুধু ভুয়ো চিকিৎসকরাই নয়, যারা এই জাল সার্টিফিকেট বিলি করেছে, তাদেরও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক।”

জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক সংস্থা ‘এনএমও’-এর দক্ষিণবঙ্গ সম্পাদক অর্পণ পাল এই সংকটকে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য চরম হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি পাস করে নিজেদের এমডি, এমএস কিংবা সুপার-স্পেশালিস্ট দাবি করে রোগীদের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। সরকার যদি এখনই কড়া হাতে এই জালি ডিগ্রিধারী ও তাদের পেছনের মাস্টারমাইন্ডদের দমন না করে, তবে রাজ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।