মুম্বাই নয়, এবার খাস দিল্লিতে বসছে মায়ানগরীর মেলা! কীভাবে রাজধানী কাঁপছে বাপ্পার আগমনে?

সারাদেশে এখন মহা উৎসাহের সঙ্গে পালিত হচ্ছে ভক্তদের পরম আরাধ্য গণপতি উৎসব। ভক্তিভরে ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। সাধারণত এই উৎসবের কথা বললেই মুম্বাইয়ের বিশাল প্যান্ডেল এবং জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে বিশ্বাস করুন বা না করুন, এখন আর বাপ্পার টানে মুম্বাই যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’র সেই অপরূপ আমেজ এখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি-এনসিআর জুড়ে। কোনো প্যান্ডেলে দেখা মিলছে মহারাষ্ট্রের খাঁটি ঐতিহ্যবাহী ছোঁয়া, আবার কোথাও ফুটে উঠছে দিল্লির তরুণ প্রজন্মের আধুনিক ও ট্রেন্ডি রূপ। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে পূজার পাশাপাশি গান, নাচ, জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রেজ এই উৎসবকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
মুম্বাই থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে রাজধানীতে বাপ্পার এই আগমন নেহাতই একটি সাধারণ উৎসবের কাহিনী নয়; এটি সেইসব সাহসী মানুষের সংকল্পের গল্প, যারা বহু বছর আগে মহারাষ্ট্রের মাটি, মাতৃভাষা, অনন্য স্বাদ এবং ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন দিল্লিতে এবং তা পরম যত্নে পৌঁছে দিচ্ছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। দিল্লির সুপ্রাচীন মারাঠি সম্প্রদায় মহারাষ্ট্রের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ সমুন্নত রেখে প্রতি বছর অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে এই মহোৎসব উদযাপন করে আসছে। আনন্দ বিহারের বাসিন্দা প্রশান্ত সাঠে দিল্লিতে তাঁর জীবনের ৪৩তম গণেশ উৎসব পালন করছেন। তাঁর কাছে এই উৎসব শুধুই একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ব্যস্ত রাজধানীতে বসে নিজের শিকড় এবং গ্রামকে গভীরভাবে অনুভব করার এক দারুণ সুযোগ। বর্তমান সময়ে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি সক্রিয় মারাঠি সম্প্রদায়ের গোষ্ঠী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই উৎসব পরিচালনা করছে।
১৯৮৪ সাল থেকে পূর্ব দিল্লির পূর্বাঞ্চল মহারাষ্ট্র মণ্ডলের হাত ধরে এখানে গণেশ উৎসব উদযাপনের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল রূপ নিয়েছে। দিল্লির সুবৃহৎ ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে প্রতিটি প্যান্ডেলে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, তাই এখানকার মারাঠি পরিবারগুলো নিজেদের সুবিধার্থে নিজ নিজ এলাকায় আলাদা মন্ডল গড়ে তুলেছে। কার্টুনিস্ট মাধব জোশী গত ২৩ বছর ধরে দিল্লিতে থেকেও নিজের হাতে বাপ্পার প্রতিমা তৈরি করে আসছেন, যা এই সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তবে মহানগরের ব্যস্ত জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে এই উৎসবের ঐতিহ্যগত সময়সূচিতেও এসেছে পরিবর্তন। এখন অনেক জায়গায় গণেশ উৎসব দেড় দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন কিংবা দশ দিন ধরে পালিত হচ্ছে।
তিলকের সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করে আজকের দিল্লির জাঁকজমকপূর্ণ মন্ডল—সবকিছুর মূলে রয়েছে সমাজকে এক সুতোয় বাঁধার শক্তি। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মূলত সমাজের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একত্রিত করার মাধ্যম হিসেবে এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন। বর্তমানে দিল্লির ঘরে ঘরে গণপতি প্রতিমা স্থাপন, নয়নাভিরাম প্যান্ডেল সাজানো এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক—সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখন আর এটি শুধু মারাঠিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বহু অ-মারাঠি পরিবারও এই উৎসবে সমানভাবে শামিল হচ্ছে। জনকপুরীর দোকানদার নীলিমা ভাগবত প্রতি বছর মহারাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার মূর্তি আনিয়েও ক্রেতাদের চাহিদা মেলাতে হিমশিম খান। ১৯১৯ সালে মহারাষ্ট্র স্নেহ সংবর্ধক সমাজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিল্লির মারাঠিদের সামাজিক জীবন আরও বেশি সুসংগঠিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে ১৪ থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহারাষ্ট্র সদনে মারাঠি থিয়েটার, লোকশিল্প, লাবণী এবং নৃত্যের সমাহারে যে জমজমাট আয়োজন হয়, তা প্রমাণ করে যে বাপ্পার উপস্থিতি এখন দিল্লির ঐতিহ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।