দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন থেকে ঠিক কী পেল ভারত? মোদীর মাস্টারস্ট্রোকে কি ব্যাকফুটে চিন-রাশিয়া?

দিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬ বিশ্ব রাজনীতির আঙিনায় এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে চলা এই আন্তর্জাতিক মেগা ইভেন্ট থেকে ভারত কূটনৈতিকভাবে ঠিক কী অর্জন করল, তা নিয়ে কৌতুহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। поверх দৃষ্টিতে ছবি বা করমর্দনের বাইরে গিয়ে এই সম্মেলনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানের খণ্ডিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারত আরও একবার তার স্বতন্ত্র ও জোরালো অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের আমল থেকেই নয়াদিল্লি ব্রিকসকে অ-পশ্চিমি দেশগুলির কণ্ঠস্বর তোলার একটি শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে দেখে আসছে। তবে এই মঞ্চ যাতে সরাসরি কোনো পশ্চিম-বিরোধী জোটে পরিণত না হয়, সেদিকেও ভারতের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। ভারতের মূল লক্ষ্য বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (IMF) ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার ঘটিয়ে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষা মিললেও, প্রযুক্তি ও পুঁজির স্বার্থে পশ্চিমের বাজার থেকে ভারত নিজেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
সম্মেলনের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য ছিল একে আমেরিকা-বিরোধী বক্তৃতার মঞ্চে পরিণত হতে না দেওয়া। অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর মতো কোনো নাটকীয় ঘোষণা ছাড়াই আলোচনা দ্বিপাক্ষিক লেনদেন, ডিজিটাল জনপরিকাঠামো এবং জ্বালানি সুরক্ষার মতো বাস্তবসম্মত বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। সদস্য দেশগুলির মধ্যে নানা মতপার্থক্য সত্ত্বেও সর্বসম্মতিক্রমে ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ পাস হওয়া ভারতের কূটনৈতিক দূরদর্শিতারই প্রমাণ। পাশাপাশি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে মস্কোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের স্থায়িত্ব প্রমাণ করলেও, রাশিয়া-চিন নেতৃত্বাধীন কোনো বিশেষ শিবিরে যে ভারত নাম লেখায়নি, তা পরিষ্কার। অন্যদিকে, প্রায় সাত বছর পর চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কে সাময়িক বরফ গলালেও সীমান্ত শান্ত না হওয়া পর্যন্ত যে প্রকৃত স্বাভাবিকতা আসবে না, তা নয়াদিল্লি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রিকস সম্মেলনে মোদী, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি দেখে ভারতের শিবির বদলের কোনো অবকাশ নেই। বহুমেরু বিশ্বে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের স্বার্থরক্ষা করাই ভারতের আসল কূটনৈতিক শক্তি। আগামী ২০২৭ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব চিনের হাতে যাওয়ার পর নয়াদিল্লি এই ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।