ইভিএম থেকে ভোট গণনা—প্রতিটি পদে কড়া নজরদারি! ভারতীয় গণতন্ত্রের বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি নিয়ে বড় দাবি জ্ঞানেশ কুমারের

ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা যে বিশ্বের অন্যতম স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং ত্রুটিহীন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক মহলে তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোটগ্রহণ এবং ভোট গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কড়া নজরদারির মাধ্যমে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত অটল কালাম হলে আয়োজিত ‘বুথ লেভেল অফিসারদের সঙ্গে মতবিনিময়’ (Interaction with Booth Level Officers) শীর্ষক এক বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর এই বক্তব্যে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত কতটা মজবুত, তা ফের স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ভোটার তালিকার নিখুঁত মান ও নির্ভুলতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দল এবং তাদের অনুমোদিত বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA) সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের (BLO) প্রাথমিক ও মূল দায়িত্ব হলো ভোটার তালিকা থেকে নিখুঁতভাবে মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত বা ভিনরাজ্যের ভোটারদের নাম যথাযথভাবে চিহ্নিত করে তা বাদ দেওয়া। একই সঙ্গে দেশের কোনো যোগ্য নাগরিক যাতে কোনোভাবেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে, ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া প্রতিটি তরুণ ভারতীয় নাগরিকের নাম যাতে বাধ্যতামূলকভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়, সে বিষয়ে সমস্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের অত্যন্ত সচেষ্ট থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার দিকটি ব্যাখ্যা করে জ্ঞানেশ কুমার জানান যে, মূল নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর অনুমোদিত পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে মক পোলের মাধ্যমে ইভিএম (EVM) এবং ভিভিপ্যাট (VVPAT) যন্ত্রের কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। এরপর ভোটগ্রহণ পর্ব সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রার্থীদের নিজ নিজ এজেন্টদের উপস্থিতিতেই সমস্ত ইভিএম সিল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে, ভোট গণনার দিনেও প্রার্থীদের অনুমোদিত গণনাকারী এজেন্টদের সরাসরি উপস্থিতিতে ইভিএমের প্রাপ্ত ভোটের ফলাফলের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ফর্ম ১৭সি’ (Form 17C)-তে থাকা তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ মিলিয়ে যাচাই করা হয়, যা জালিয়াতির সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

নির্বাচনী তালিকার দীর্ঘমেয়াদী শুদ্ধতা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন নিয়মিতভাবে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া পরিচালনা করে থাকে। এই কাজের অংশ হিসেবে বিএলও-রা সরাসরি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই, ম্যাপিং ও শুনানির মাধ্যমে তালিকার যাবতীয় ত্রুটি দূর করেন। গণতন্ত্রের এই বিশাল মহাযজ্ঞে দেশের তরুণ প্রজন্মকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল করতে আমেদাবাদে আয়োজিত পঞ্চম আঞ্চলিক সম্মেলনেও বিশেষ গুরুত্ব দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। সেখানে তিনি তরুণ নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে বিশেষভাবে ‘ইসিআইনেট’ (ECINET) অ্যাপ ডাউনলোড করার এবং স্কুল-কলেজে সক্রিয় ইলেক্টোরাল লিটারেসি ক্লাবের (ELC) মাধ্যমে সঠিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বর্তমানে বিশ্বের ৩৫টি প্রধান গণতান্ত্রিক দেশের শীর্ষ সংগঠনের সংস্থাও তথা আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও নির্বাচনী সহায়তা ইনস্টিটিউটের (International IDEA) প্রেসিডেন্সি বা সভাপতির ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে ভারত। ভারতের এই সুমহান আন্তর্জাতিক নেতৃত্বই বিশ্ববাসীর সামনে আবারও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, দেশের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচনী ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মহলে কতটা গভীরভাবে সমাদৃত। পরিশেষে, ১৮ বছর বয়স হলেই দেশের প্রতিটি তরুণ নাগরিককে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তোলার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনগুলোতে নির্ভয়ে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে তাদের পবিত্র গণতান্ত্রিক কর্তব্য পালন করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।