নয়াদিল্লিতে মোদি-ইব্রাহিম মেগা বৈঠক! ব্রিকস সামিটের ফাঁকে বড় কৌশলগত চালে কী বার্তা দিল ভারত?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউসে আজ শনিবার সকালে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত এই দুই রাষ্ট্রনেতার একান্ত বৈঠকটি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে ভারতের সফল সভাপতিত্বে আয়োজিত এই মেগা সামিটে মালয়েশিয়া অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশীদার দেশ হিসেবে যোগদান করেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দিল্লির কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে চলেছে।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি আগত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ধারাবাহিক ও সুসংহত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই আলোচনা। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক অগ্রগতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার বিষয়ে দুই শীর্ষ নেতা বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই অংশীদারিত্ব আগামী দিনে দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলেই কূটনৈতিক মহলের অভিমত।

এদিকে, শনিবার নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী নয়াদিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন ভিয়েতনামের বিশিষ্ট প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং। ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই ১৮তম ব্রিকস লিডার্স সামিটে যোগ দিতেই তাঁর এই বিশেষ সফর। উল্লেখ্য, ব্রিকস অংশীদার দেশ হিসেবে ভিয়েতনামের এটি দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণ হলেও, প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুংয়ের ক্ষেত্রে এটিই প্রথমবার এই আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে সরাসরি অংশ নেওয়া। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর জুড়ে তাঁর একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক মৈত্রীকে আরও সুদৃঢ় করবে।

শনিবারের এই মেগা সামিটের মূল রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু ছিল নয়াদিল্লির অত্যাধুনিক ভারত মণ্ডপম চত্বর। এদিন দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে সেখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজড-ডোর বা বন্ধ দরজার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সমস্ত সদস্য দেশের শীর্ষ নেতারা অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এবং বহুপাক্ষিকতাকে (Multilateralism) আরও বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর করার বিষয়ে গভীর মতবিনিময় করেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার রূপ পরিবর্তনে এই আলোচনা বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বন্ধ দরজার বৈঠকের পর রাষ্ট্রনেতারা ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত সর্বাধুনিক ‘ভারত ইনোভেটস এক্সপোজিশন’ (India Innovates Exposition) পরিদর্শন করেন। এই প্রদর্শনীতে ভারতের প্রায় ৩৭টি তাক লাগানো এবং যুগান্তকারী ডিপ-টেক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এরপর ঐতিহ্য বজায় রেখে সমস্ত আমন্ত্রিত রাষ্ট্রনেতারা একটি যৌথ ছবি তোলার পর্ব এবং প্রতীকী গাছ লাগানোর কর্মসূচিতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এরপর দিনের সমাপ্তি ঘটে এক জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজের মাধ্যমে, যার আয়োজন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে।

অন্যদিকে, ব্রিকস সম্মেলনের পরবর্তী ও চূড়ান্ত পর্বের সূচনা হবে আগামী রবিবার, যেখানে সমস্ত ব্রিকস অংশীদার ও আউটরিচ দেশগুলির শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে অংশ নেবেন। আগামী রবিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে নির্ধারিত মূল উন্মুক্ত অধিবেশন শুরু হবে। এই বিশেষ অধিবেশনে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে বিশদ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই উন্মুক্ত অধিবেশন এবং ধারাবাহিক আলোচনার ঠিক পরেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ (New Delhi Declaration)-এর রূপরেখা এবং সম্মেলনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে।