ফাঁসির দড়ি থেকে সরাসরি দেশের সর্বেসর্বা! ১৯৭১-এর সেই গোপন বৈঠক ও রহস্যময় সাধুর কোন ভবিষ্যৎবাণী বদলে দিয়েছিল ইতিহাস?

ইতিহাসের বিশাল পাতায় এমন কিছু অজানা ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় চাপা পড়ে থাকে, যা বারবার আমাদের সামনে এই প্রশ্ন তুলে দেয়—ঘটনাগুলো কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো অলৌকিক দিব্যদৃষ্টি? ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম পুরুষ নিম করোলি বাবাকে নিয়ে এমনই এক অবিশ্বাস্য ও রহস্যে ঘেরা গল্প প্রচলিত রয়েছে, যা সরাসরি জড়িত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোর সঙ্গে। জনশ্রুতি রয়েছে যে, ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে বাবা যখন দিল্লির বিড়লা মন্দিরে অবস্থান করছিলেন, ঠিক সেই সময়ই সেখানে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক তাঁর আশীর্বাদ নিতে এসেছিলেন। কথিত আছে, সেই বিশাল জনসমুদ্রের ভিড় থেকে বাবা স্বয়ং এমন এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যার ভাই তখন ভিনদেশের কারাগারে চরম সঙ্কটে বন্দি রয়েছেন। এরপরই সেই গোপন বৈঠকে পাকিস্তানের কারাগার, মৃত্যুদণ্ডের হুকুম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রক্ষমতার মতো চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম হেফাজতে বন্দি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কুখ্যাত সামরিক অভিযানের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে সুদূর পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রাখা হয়। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন পুরনো প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই দুঃসময়ে দিল্লির বিড়লা মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন নিম করোলি বাবা। কিছু বাংলাদেশি নাগরিক যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন বাবা ভিড়ের মধ্য থেকে বার্তা পাঠান যে—যার ভাই জেলে বন্দি, তিনি যেন দ্রুত তাঁর কাছে আসেন। সেই ব্যক্তি বাবার সামনে হাজির হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং জানান যে তাঁর ভাই পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেলে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং তাঁকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে। তখন সমস্ত সঙ্কটের অবসান ঘটিয়ে বাবা তাঁকে অভয় দিয়ে বলেন যে, তাঁর ভাই খুব শীঘ্রই শত্রুর বন্দিদশা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে বীরের বেশে দেশে ফিরবেন। শুধু তাই নয়, লোককথায় এও দাবি করা হয় যে বাবা স্বয়ং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—সেই বন্দি নেতা একদিন নিজের দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য যেন এখনই প্রস্তুতি শুরু করা হয়। বলা হয়ে থাকে, বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ভাই।
ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রামাণিক নথি অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান সত্যিই পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাঁর মুক্তির পথ চিরতরে প্রশস্ত করে দেয়। ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি পাকিস্তান সরকারের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর প্রথমে লন্ডন এবং সেখান থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি, যেখানে দেশের লাখো মানুষ তাঁকে অভূতপূর্ব ও হর্ষিত সংবর্ধনায় বরণ করে নিয়েছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে নতুন স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ফাঁসির সেলে বন্দি থাকা একজন নেতার এমন অবিশ্বাস্য মুক্তি এবং স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র হিসেবে তাঁর পুনরুত্থান কেবল একটি সাধারণ প্রত্যাবর্তন ছিল না, বরং তা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি নতুন জাতির টিকে থাকা ও বিজয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে রয়েছে।