বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল বা ইন্টারনেটও ছোঁয়নি! অন্ধ্রের এই গ্রামে আধুনিক দুনিয়া ছেড়ে কীভাবে বাঁচছেন ১৭টি পরিবার?

স্মার্টফোন, হাই-স্পিড ইন্টারনেট আর আধুনিক প্রযুক্তির রঙিন দুনিয়ায় ২৪ ঘণ্টা অনলাইন থাকাটাই যেখানে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, ঠিক তার বিপরীত ছবি দেখা গেল অন্ধপ্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রামে। অন্ধাকপল্লি পাহাড়ের কোলে প্রায় ৬০ একর এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা ‘কুর্মাগিরাম বৈদিক ভিলেজ’-এর ১৭টি পরিবার স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে একেবারে নিখাদ প্রাচীন বৈদিক জীবনধারা। যে যুগে বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন বা এলপিজি সিলিন্ডার ছাড়া জীবনযাপন কল্পনা করাই অসম্ভব, সেখানে এই আধুনিক সুবিধাহীন জীবনকেই পরম শান্তি বলে মনে করছেন তাঁরা।

শ্রীকাকুলাম জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি ২০১৮ সালে নন্দ গোকুলম গোশালা ট্রাস্টের উদ্যোগে পথ চলা শুরু করে। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা এ সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের শিক্ষা এই জীবনধারার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। এই গ্রামের প্রতিটি দিনের শুরু হয় অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠভাবে। ঘড়ির অ্যালার্ম নয়, রাত ৩টে থেকে সাড়ে ৩টের মধ্যে অর্থাৎ ব্রহ্মমুহূর্তেই ঘুম থেকে ওঠেন বাসিন্দারা। তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলোয় স্নান সেরে তাঁরা প্রার্থনাকক্ষে জড়ো হন, যেখানে চলে আরতি, ভজন ও যোগাভ্যাস। আধুনিক কনভেন্ট স্কুলের বদলে শিশুদের শিক্ষার জন্য রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গুরুকুল ব্যবস্থা, যেখানে সংস্কৃত, বেদ, ভগবদ্গীতা, রামায়ণ ও মহাভারতের পাঠের পাশাপাশি পড়ানো হয় তেলুগু, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানও।

প্রকৃতির নিয়মে চলা এই গ্রামের জীবনযাত্রায় বিদ্যুতের কোনো স্থান নেই। ফলে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসে এবং রাত ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন সকলে। আধুনিক সিমেন্ট বা রড-লোহার পাকা বাড়ি তৈরির বদলে এখানকার ঘরগুলি তৈরি হয় মাটি, কাঠ, পাথর ও চুন দিয়ে। ঘরের মেঝে পরিষ্কার রাখতে ব্যবহার করা হয় ঐতিহ্যবাহী গোবর ও মাটির প্রলেপ। পানীয় বা দৈনন্দিন জলের প্রয়োজনে প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব কুয়ো রয়েছে এবং রান্নার কাজ হয় সম্পূর্ণ কাঠের উনুনেই।

কৃষিকাজেও বজায় রাখা হয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। রাসায়নিক সার বা বিষাক্ত কীটনাশকের ত্রিসীমানায় না গিয়ে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে নিজেদের জমিতে ধান, শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করেন তাঁরা। খাদ্যের দিক থেকে এই গ্রামটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়, কর্পোরেট ব্যস্ততা ও মানসিক চাপকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে বহু উচ্চবিত্ত বা ভালো চাকরি করা মানুষও স্বেচ্ছায় এই গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তির কৃত্রিম কোলাহল ছেড়ে এই শান্ত, সরল ও প্রকৃতিমুখী পরিবেশেই তাঁরা জীবনের আসল শান্তি ও উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন।

Aditi Banik
  • Aditi Banik