ভারতের মাটিতে বসছে ব্রিকসের মেগা আসর! ২০২৬-এর এই ঐতিহাসিক সম্মেলনে কোন বড় বার্তা দিচ্ছে নয়াদিল্লি?

বিশ্বের প্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ব্রিকস-এর ১৮তম ঐতিহাসিক সম্মেলন এবার অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ভারতে। আগামী ২০২৬ সালের ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে এই মেগা সম্মেলন বসবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন জোটটির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।

শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিনকে নিয়ে ‘ব্রিক’ (BRIC) নামে এই জোট যাত্রা শুরু করেছিল। ২০০৬ সালে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার পাশাপাশি প্রথমবার এই দেশগুলোর বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠক হয়। এরপর ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হওয়ার পর এই জোটের নাম হয় ‘ব্রিকস’ (BRICS)। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়া পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। বর্তমানে ১১টি পূর্ণ সদস্য দেশ এবং বেশ কিছু সহযোগী দেশকে নিয়ে এই জোট বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

ভারতের সভাপতিত্ব ও মূল ভিত্তি:
২০২৬ সালে ভারতের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনের মূল থিম হলো—“Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability” অর্থাৎ “স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ”। নয়াদিল্লির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো, কেবল রাজনৈতিক আলোচনার গণ্ডf পেরিয়ে বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, নগর উন্নয়ন, এমএসএমই খাতের ক্ষমতায়ন, স্টาร์আপ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী সহযোগিতা স্থাপন করা। ভারতের এই কর্মপরিকল্পনা চারটি মূল স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৃষি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ:
অর্থনৈতিক পরিচালনা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই জোট ‘ব্রিকস ইকোনমিক পার্টনারশিপ ২০৩০’-এর কৌশলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSMEs)-কে চাঙা করতে এবং সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করতে ‘ব্রিকস গ্লোবাল ভ্যালু চেইনস অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৬-২০৩০’ গ্রহণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যবসার সুবিধার্থে ‘ব্রিকস ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং মেকানিজম’ এবং ‘ব্রিকস এমএসএমই কো-অপারেশন পোর্টাল’-এর প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে ‘ব্রিকস ইনকিউবেটর নেটওয়ার্ক’ এবং ‘ব্রিকস স্টার্টআপ ইনোভেশন ফান্ড’-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে যুক্ত করতে ‘ব্রিকস নেটওয়ার্ক অন ডিজিটাল এগ্রিকালচার’ এবং ‘ব্রিকস অ্যাগ্রিন’ উদ্যোগ গঠন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও জলবায়ু সুরক্ষা:
স্বাস্থ্যখাতে সর্বজনীন পরিষেবা ও মহামারী মোকাবিলার পাশাপাশি নিমহানস (NIMHANS)-এর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। শক্তি সুরক্ষার ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড নির্দেশিকা এবং ‘ব্রিকস ডিজিটাল সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ফর স্মার্ট গ্রিডস অ্যান্ড এনার্জি স্টোরেজ’ চালু করা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, টেকসই নগর উন্নয়ন এবং লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন উন্নত করতে একাধিক যুগান্তকারী ফ্রেমওয়ার্কের প্রস্তাব পেশ করেছে ভারত, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।