জ্বলছে সামরিক গাড়ি, চারদিকে শুধু মৃতদেহ! পাক সেনার ওপর বালোচ বিদ্রোহীদের সর্বনাশা হানায় কেঁপে উঠল জিয়রত ক্রস

পাকিস্তানের মাটিতে ফের এক রক্তক্ষয়ী ও বড়সড় হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের অশান্ত বালোচিস্তান প্রদেশে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি শক্তিশালী কনভয়ের ওপর অতর্কিত ও বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। এই ভয়াবহ হামলার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি। বিএলএ-র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মোট ২৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর একাধিক গাড়িতে আগুন ধরিয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়েছে। ‘দ্য বালুচিস্তান পোস্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএলএ-র একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র জানিয়েছেন যে তাঁদের সশস্ত্র যোদ্ধারা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে জিয়ারত ক্রসের কাছে পাকিস্তানি সেনার এই কনভয়টিকে ঘিরে ধরে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সুনিপুণ কায়দায় সেনাবাহিনীর একটি ভারী ট্রাকসহ মোট দুটি সামরিক গাড়ি একেবারে ধ্বংস করে দেয়।

বালোচ লিবারেশন আর্মি প্রথমে তাদের প্রাথমিক বিবৃতিতে ১৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার দাবি করলেও, পরবর্তীতে সেই মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫ জন বলে নিশ্চিত করে। শুধু তাই নয়, এই হামলার সত্যতা প্রমাণ করতে বিএলএ তাদের অফিসিয়াল ও গোপন মিডিয়া চ্যানেল ‘হাক্কাল’-এ ১ মিনিট ১১ সেকেন্ডের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও ট্রেলারও প্রকাশ্যে এনেছে। ওই সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, প্রকাশিত এই ভিডিওটিতে জিয়ারত ক্রসের রক্তক্ষয়ী হামলার আসল ফুটেজ তুলে ধরা হয়েছে। বিএলএ-র প্রকাশিত সেই গ্রাফিক ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, সশস্ত্র বালোচ যোদ্ধারা পুড়তে থাকা পাকিস্তানি সামরিক গাড়ির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে উল্লাস করছে। এমনকি ভিডিওটিতে বেশ কিছু মৃতদেহ এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান রয়েছে। এই ট্রেলারটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে বালোচ লিবারেশন আর্মি হুংকার দিয়ে জানিয়েছে যে, হামলার সম্পূর্ণ ও দীর্ঘ ভিডিওটি এখনও বাকি রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে তা প্রকাশ্যে আনা হবে।

এদিকে, জিয়রত ক্রসের এই বড় হামলার পাশাপাশি বালোচিস্তানের সুরাব এলাকার হাজিকা অঞ্চলে আরেকটি পৃথক ও ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। বিএলএ-র বিশেষ শাখা ‘স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল অপারেশনস স্কোয়াড’ (এসটিওএস)—এর পক্ষ থেকে সুরাবের হাজিকা এলাকায় দূর নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সাহায্যে বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়িতে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বালোচ লিবারেশন আর্মির দাবি, এই সুনির্দিষ্ট দূর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের ধাক্কায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আরেকটি সামরিক গাড়ি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে গেছে এবং ঘটনাস্থলেই আরও সাতজন সেনা জওয়ান নিহত হয়েছেন। একের পর এক এমন হাই-প্রোফাইল হামলায় বালোচিস্তানের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন চরম প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

তবে বালোচিস্তানের এই রক্তক্ষয়ী হামলায় পাকিস্তানের ২৫ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হওয়ার বিষয়ে বিএলএ-র করা এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি পাকিস্তান সেনাবাহিনী, দেশটির সরকারি প্রশাসন কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ সূত্রের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অতীতেও বালোচিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও দেশটির অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চালানো নানা গেরিলা হামলায় বিপুল সংখ্যক সেনা হতাহতের দাবি করে এসেছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি। উল্লেখ্য, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বালোচিস্তান প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন বালোচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের মধ্যে এক অন্তহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে আসছে। বিএলএ-র মতো একাধিক সশস্ত্র বালোচ গোষ্ঠী পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দীর্ঘদিনের মূল দাবি হলো প্রদেশের জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং সামগ্রিক স্বাধীনতা অর্জন করা। বালোচিস্তানের এই চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা পাকিস্তানের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে বরাবরই এক দীর্ঘমেয়াদী ও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে, বিশেষ করে প্রদেশটির প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলির সশস্ত্র তৎপরতা দমন করতে নিয়মিত বড়সড় সামরিক অভিযান চালায় পাক বাহিনী।