উত্তম কুমারকে নিয়ে আজও বুকের ভিতর চেপে রাখা সেই কষ্ট! মহানায়কের জন্মশতবার্ষিকীতে আবেগঘন ডিরেক্টর!

মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের এই পবিত্র লগ্নে দাঁড়িয়ে স্মৃতির সরণি বেয়ে উঠে এল এমন কিছু অজানা এবং রোমহর্ষক অধ্যায়, যা আজও বাংলা সিনেমার সোনালী ইতিহাসকে জীবন্ত করে রাখে। উত্তম কুমার নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হৃদয়ে যে শ্রদ্ধার দোলা লাগে, তা কেবল একজন শিল্পীর প্রতি নয়, বরং একজন অসামান্য ভালো মানুষের প্রতিও বটে। তাঁর সঙ্গে কাজের সুযোগ পাওয়া, তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর সাহচর্য লাভ করা জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলেই মনে করেন তাঁর সঙ্গে কাজ করা শিল্পীরা। তবে এই উদযাপনের আলোয় আজও প্রচ্ছদে লুকিয়ে রয়েছে একরাশ গভীর আক্ষেপ—উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই লেখা একটি চিত্রনাট্য তাঁর সঙ্গে আর করা হয়ে ওঠেনি, কারণ তার আগেই চিরকালের মতো না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন মহানায়ক।
উত্তম কুমারের ব্যক্তিত্ব ছিল চুম্বকের মতো আকর্ষক। শুধু তাঁর রূপ বা শারীরিক গঠনই নয়, বরং তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, চালচলন, মানুষের সঙ্গে মেশার অমায়িক ক্ষমতা এবং মার্জিত ব্যবহার মানুষকে অবলীলায় কাছে টেনে নিত। মহিলারা তো বটেই, পুরুষরাও তাঁর ব্যক্তিত্বের জাদুতে মুগ্ধ হতেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে সহকর্মীরা জানান যে, সেটে তিনি কখনোই কোনো অহংকার দেখাতেন না। বরং নতুন বা সহকর্মী শিল্পীদের সঙ্গে এমন এক সহজ ও ঘরোয়া সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতেন যা কিংবদন্তি অভিনেতাদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। তিনি সস্নেহে ‘তুই’ বলে ডাকতেন এবং কাজের মাঝেও এক অদ্ভুত বন্ধুসুলভ পরিবেশ বজায় রাখতেন।
উত্তম কুমারের পেশাদারিত্ব এবং চরিত্রের প্রতি চরম দায়বদ্ধতার বহু সাক্ষী রয়েছে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ‘অমানুষ’ ছবির শ্যুটিংয়ের সেই দিনটির কথা আজও সিনেপ্রেমীদের শিহরিত করে। সুন্দরবনের দুর্গম আউটডোরে শ্যুটিং চলাকালীন উত্তম কুমারের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, যা পুরো ইউনিটকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। শ্যুটিংয়ের একটি দৃশ্যে উঁচুতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে সবাই যখন উদ্বিগ্ন, তখন তিনি বিন্দুমাত্র পিছপা হননি। পরিচালক বা সহকর্মীরা দৃশ্যটি বদলানোর কথা বললেও উত্তম কুমার স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, চরিত্রের প্রয়োজনে যা যা করা দরকার, তিনি তাই করবেন। হার্টের অসুখ তাঁর নিজের ছিল, চরিত্রের নয়—এই মানসিকতাই তাঁকে সাধারণ থেকে মহানায়ক করে তুলেছিল। একটি দৌড়ানোর দৃশ্যে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ক্যামেরার সামনে নিজের শারীরিক কষ্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়।
অনেকেই হয়তো জানেন না, ‘অমানুষ’ ছবির সময়ে উৎপল দত্তের হাঁটার ভঙ্গি দেখে উত্তম কুমারকে একটি ছোট পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সেই পরামর্শ বিন্দুমাত্র অহংকার না দেখিয়ে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এটি তাঁকে ‘অভিনয় শেখানো’ ছিল না, বরং একজন মহাতারকার বিনম্র মানসিকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন ছিল। এত বড় মাপের একজন অভিনেতা হয়েও জুনিয়রদের কোনো ভালো পরামর্শকে সম্মান জানানোর এই গুণই তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।
তবে সবকিছুর পরেও একটা সুপ্ত আক্ষেপ রয়েই গেছে। উত্তম কুমারকে ভাবিয়েই একটি আস্ত চিত্রনাট্য তৈরি করা হয়েছিল। চিত্রনাট্য শোনার পর মহানায়ক স্ক্রিপ্টটির প্রশংসা করলেও তাঁর বয়সের সঙ্গে চরিত্রটি মানানসই নয় বলে ছবিটিতে অভিনয় করতে রাজি হননি। পরবর্তীতে সেই চরিত্রে অন্য অভিনেতা অভিনয় করলেও, উত্তম কুমারকে দিয়ে সেই স্বপ্নের প্রজেক্টটি রূপায়ণ করতে না পারার আক্ষেপ আজও পরিচালক ও শুভানুধ্যায়ীদের মনকে ভারাক্রান্ত করে। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে মনে হয়, শত বছর পরেও উত্তম কুমার বাঙালির আবেগের আসমানে এক এবং অদ্বিতীয় ধ্রুবতারা হয়েই বেঁচে আছেন।