সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্বের ফাঁদ! দিল্লির তরুণ দম্পতির কাণ্ড ফাঁস হতেই নড়েচড়ে বসল গোয়েন্দারা

সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব এবং পরবর্তীতে ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক তৈরি করে দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন তথ্য পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর (ISI) হাতে তুলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এল। সম্প্রতি দিল্লিতে এক তরুণ দম্পতির গ্রেপ্তারের পর ফের একবার পাকিস্তান এজেন্সির সেই পুরোনো অথচ মারাত্মক ‘হানি ট্র্যাপ’ (Honey Trap) কৌশল নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে। একের পর এক ঘটনায় অনলাইন ফাঁদ পেতে কীভাবে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো ধ্বংসের চক্রান্ত চলছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তদন্তকারীরা।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কর্মীদের প্রোফাইল নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে সম্ভাব্য টার্গেট বেছে নেয় পাকিস্তানি হ্যান্ডলাররা। শুধু ইউনিফর্ম পরিহিত আধিকারিকরাই নন, বরং মানসিকভাবে দুর্বল বা সহজে প্রলোভনে পড়তে পারেন এমন ব্যক্তিদেরও নজরে রাখা হয়। এরপর ভারতীয় সিম কার্ড ব্যবহার করে তৈরি করা ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে টার্গেটের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনায় ২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাহিল এবং তাঁর ২১ বছর বয়সী স্ত্রী সামিরা ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় আটটি ভারতীয় সিম কার্ড অবৈধভাবে সংগ্রহ করে দুবাইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানে পাচার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে জানা গিয়েছে, পাকিস্তান থেকে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করতে এবং ভারতের সংবেদনশীল গ্রুপে প্রবেশাধিকার পেতেই এই সিমগুলি ব্যবহার করা হতো।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো সুন্দরী মহিলার ছবিযুক্ত প্রোফাইল থেকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠানো হয়। কথাবার্তা এগোতে এগোতে যখন তা ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখনই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলের আসল খেলা। অনেক সময় ব্যক্তিগত ছবি বা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিয়ে তা ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে বড় ধরনের গোপন নথি আদায় করা হয় বলে অনুমান গোয়েন্দাদের।

এর পাশাপাশি চলতি বছরের মে মাসে গ্রেপ্তার হওয়া এক কর্মরত ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডারের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই সেনাকর্মীও পাকিস্তানি এজেন্টদের হানি ট্র্যাপে সম্পূর্ণভাবে ফেঁসে গিয়েছিলেন এবং দেশের একাধিক গোপন তথ্য শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ব্যক্তিগত ছবি পাওয়ার বিনিময়ে তাঁকে যুদ্ধ-সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপন নথি সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এক সহকর্মীর মোবাইল ফোনে গোপন তথ্য চুরির বিপজ্জনক সফটওয়্যার ইনস্টল করার গুরুতর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।

অবশ্য এই ধরনের হানি ট্র্যাপের ঘটনা ভারতের ক্ষেত্রে নতুন নয়। এর আগেও প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (DRDO)-র প্রাক্তন বিজ্ঞানী প্রদীপ কুরুলকরকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা এজেন্টের কাছে সংবেদনশীল তথ্য পাচার করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে ১,৮৩৭ পাতার একটি মেগা চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ সালে মস্কোয় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সতেন্দ্র সিওয়ালকেও হানি ট্র্যাপে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যা দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

বর্তমান সময়ের এই ঘটনাগুলি থেকে স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের গোয়েন্দারা পুরনো গুপ্তচরবৃত্তির কৌশলের সঙ্গে অত্যাধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমকে হাতিয়ার করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাথমিক পরিচয়, সুকৌশলে প্রেমের জাল এবং পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা সিক্রেট চুরির এই নতুন পদ্ধতি ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সেনা কর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সোশ্যাল মিডিয়ায় অচেনা প্রোফাইল এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।