নেপালে জলপ্রলয়ের পরেই চিনের ‘জলবোমা’ আতঙ্ক! সিকিম ও দার্জিলিঙের কপালে কি তবে ভয়ংকর শনি?

রাক্ষুসে জলস্রোতে নিমেষে ভেসে গিয়েছে নেপাল। আচমকা তিব্বত থেকে কোশী নদী বেয়ে নেমে আসা হাজারটা জলপ্রপাতের সমান হড়পা বানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে নেপালের রাসুয়া ও ধাদিংয়ের মতো একাধিক জেলা। এই তাণ্ডবে শয়ে শয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় তিনশো ভারতীয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া নেপাল বিপর্যয়ের সেই ভয়ঙ্কর ভিডিওগুলি দেখে শিউরে উঠছেন সকলে। আর এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেই বাংলার পাহাড়বাসীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এক আতঙ্কের প্রশ্ন—এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি কি ঘটতে পারে সিকিম কিংবা আমাদের দার্জিলিঙেও? এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্ট পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
সিকিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে কি বড় বিপদের মেঘ?
পরিবেশবিদ ড. সুজীব করের মতে, সিকিমের উত্তরপ্রান্ত সহ বিভিন্ন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। ২০২৩ সালের সিকিম বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনও তাজা, ফলে যে কোনো মুহূর্তে এই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটে যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, চিনে ব্রহ্মপুত্র নদীর উপর যে বাঁধগুলি তৈরি হচ্ছে, তাতে সামান্য ফাটল ধরলেই সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এছাড়া তিস্তা বাঁধ এবং আপার তিস্তা বাঁধের মতো মেগা প্রজেক্টগুলি পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিতলের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সিকিমের এই অঞ্চলগুলিতে একাধিক ফল্টলাইন বা চ্যুতি রেখা রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে ঘনঘন ভূমিকম্প এবং হিমবাহ হ্রদগুলির প্রভাবে ভুটান বা অরুণাচল হিমালয়েও বড়সড় বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পাহাড়ে কোথায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি?
পরিবেশবিদ ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তীর কথায়, এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে তিব্বতীয় সীমান্ত থেকে। ত্রিশুল নদী তিব্বত থেকে নেপাল হয়ে গন্ডক নাম নিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। নদীর জলস্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে তা নিষ্কাশনের সুনির্দিষ্ট পথ প্রয়োজন হয়। কিন্তু সিকিমের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে অপরিকল্পিত ও মাত্রাতিরিক্ত নির্মাণের কারণে নদী উপত্যকাগুলি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা পাচ্ছে এবং সিকিমের একাধিক হিমবাহ হ্রদ বর্তমানে অত্যন্ত বিপদসংকুল অবস্থায় রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং উত্তরবঙ্গের নদীগুলি ইতিমধ্যেই রেড অ্যালার্টের আওতায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
কতটা বিপদের মুখে দার্জিলিং?
দার্জিলিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে ড. সুজীব কর জানান, কালিম্পঙের কাছে অতীতে যে বড় জলাধারটি তৈরি করা হয়েছিল, তা কতটা পরিবেশবান্ধব ছিল তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া দার্জিলিঙের পাহাড়ের মাটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার জেরে সামান্য বৃষ্টিতেই ধস নামছে। ভুটান বা সিকিমে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দার্জিলিং হিমালয় অঞ্চলে। ২০২৩ সালের মতো তিস্তা নদী ফের ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। এমনকি রঙ্গীত, তোর্সা, জলঢাকা এবং মূর্তি নদীর জলস্ফীতিও দার্জিলিং ও ডুয়ার্স এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই বিপর্যয় কি এড়ানো সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
পরিবেশবিদদের মতে, প্রকৃতির গতি পুরোপুরি রোখা না গেলেও হিমবাহ প্রবণ এলাকাগুলির মুভমেন্ট নিয়মিত মনিটরিং করা অত্যন্ত জরুরি। হিমবাহ হ্রদগুলি খালি চোখে দেখা যায় না। পাহাড়ের উপর থেকে বরফ নামার সময় প্রচণ্ড চাপে ও তলদেশের ঘর্ষণে প্রচুর শিলাপাথর নিচে নেমে আসে এবং পরবর্তীতে বরফগলা জল জমে এই হ্রদগুলির সৃষ্টি হয়। এগুলি দেখতে ছোট মনে হলেও অত্যন্ত গভীর ও জলপূর্ণ থাকে।
বিপদের মাত্রা কমাতে হলে প্রশাসনের কী করণীয়, সে বিষয়ে ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী বলেন, “সিকিমে যেভাবে নির্বিচারে সড়ক ও নির্মাণকাজ হয়েছে, তাতে মাটি আলগা হয়ে গিয়েছে। সংকীর্ণ নদীর মধ্যে দিয়ে জল যাওয়ার সময় স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষমতা হারাচ্ছে। তাই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে হলে আগাম সতর্কতা জারি করে জনবসতিপূর্ণ এলাকা খালি করতে হবে।” এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI টুল এবং স্যাটেলাইটের সাহায্যে রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ ও পাহাড়ি খাদের জল জমার ওপর কড়া নজরদারি চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।