ভিনরাজ্য ছেড়ে বাংলায় ফিরে আসুন! এলঅ্যান্ডটির বিশাল ক্যাম্পাস উদ্বোধনে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর!

নিউটাউনের সিলিকন ভ্যালি হাবে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি)-র নতুন এবং সর্বাধুনিক ক্যাম্পাস ‘আনন্দ নিকেতন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল। এদিনের এই মেগা ইভেন্টে উপস্থিত থেকে রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এক জোরালো বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অতীতের বাম আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন সরকারের আমলে উপযুক্ত শিল্প পরিকাঠামো ও সুযোগের অভাবে বাংলার মেধাবী তরুণ-তরুণীরা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের শিল্প-বান্ধব নীতি এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলেই আজ লার্সেন অ্যান্ড টুব্রোর মতো বিশ্বমানের বহুজাতিক সংস্থারা বাংলায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসছে।

এদিনের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মুখ্যমন্ত্রী কর্তৃক মঞ্চ থেকে তাৎক্ষণিক জমি বরাদ্দের ঘোষণা। এলঅ্যান্ডটি সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টরের করা আবেদনের মাত্র দু’মাসের মধ্যে নতুন ডেটা সেন্টারের জন্য আরও ১০ একর জমি মঞ্জুর করার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন তিনি। প্রশাসনিক লালফিতের ফাঁস ও দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে এমন দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিল্পায়নের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি, লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো সংস্থার নামের একটি চমৎকার ও অর্থপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সংস্থার নামের ‘এল’ অক্ষরটি দিয়ে বোঝায় ‘লোক কল্যাণ’ এবং ‘টি’ অক্ষরটি দিয়ে বোঝায় ‘ট্রান্সফরমেশন অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বা বাংলার প্রকৃত রূপান্তর। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে কিংবা নাগপুরের মতো ভিনরাজ্যের প্রযুক্তি শহরগুলিতে কর্মরত বাঙালি তরুণ প্রজন্মকে ঘরের টানে রাজ্যে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, এখন বাংলায় কাজের কোনো অভাব নেই এবং এখানকার মেধার পূর্ণ সম্মান ও মূল্যায়ন করা হবে।

নিউটাউনের সিলিকন ভ্যালিতে গড়ে ওঠা এলঅ্যান্ডটি-র এই নবনির্মিত ক্যাম্পাসটি রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অন্যতম বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। প্রথম পর্যায়ে নির্মিত দুটি অত্যাধুনিক টাওয়ারের উদ্বোধন করা হয়, যা প্রায় আট লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এই সুবিশাল ক্যাম্পাসে একসঙ্গে প্রায় ৫,৮০০ জন দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কাজ করার সুযোগ পাবেন। বিশ্বব্যাপী ব্যাঙ্কিং, ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস, এনার্জি এবং ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে পরিষেবা দেবে কলকাতার এই নতুন হাব। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ভবিষ্যতের প্রযুক্তির কাজে এটি একটি শক্তিশালী গ্লোবাল সেন্টারে পরিণত হতে চলেছে। সংস্থার চেয়ারম্যান এসএন সুব্রহ্মণ্যন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে জানান যে, আগামিদিনে এখানে আরও চারটি নতুন টাওয়ার নির্মাণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং জল সংরক্ষণের মতো বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলাকালীন প্রায় ৩,০০০ শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করে ৮.৫ মিলিয়ন সুরক্ষিত ম্যান-আওয়ারের রেকর্ড গড়েছেন, যা নির্মাণ খাতের শৃঙ্খলার এক অনন্য নজির।

রাজ্যের যুব সমাজকে স্বাবলম্বী করে তুলতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে ত্বরান্বিত করার ওপরও এদিন বিশেষ জোর দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুপ্রেরণায় রাজ্য সরকার পিএম মুদ্রা, পিএম বিশ্বকর্মা এবং পিএমইজিপি-র মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলিকে সফলভাবে রূপায়ন করছে, যার মাধ্যমে উদীয়মান তরুণ উদ্যোগপতিরা সরাসরি আর্থিক সহায়তা ও উৎসাহ পাচ্ছেন। সাইবার সিকিউরিটি এবং ক্লাউড ডেটা ম্যানেজমেন্টের মতো আধুনিক ও প্রথাবিরোধী বিষয়ে রাজ্যের যুবদের দক্ষ করে তোলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। আগামী দিনে এর ফলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। উৎসবের আবহে রাজ্যের পুনর্গঠনে সকলকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের ‘চরৈবেতি চরৈবেতি’ মন্ত্রকে পাথেয় করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সংস্থান করাই বর্তমান সরকারের প্রধান ও সর্বদাই প্রথম অগ্রাধিকার। এলঅ্যান্ডটি-র এই মেগা প্রকল্পের দ্রুত রূপায়ন এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ডেটা সেন্টারের জমি বরাদ্দ প্রমাণ করে যে, মেদহীন, গতিশীল ও কর্মমুখী প্রশাসন উপহার দিতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।