ভিনরাজ্য নয়, এবার ঘরেই মিলবে কাজ! ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের জন্য বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের

ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমানো পরিযায়ী শ্রমিকদের ফের নিজেদের রাজ্যের গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য সরকার। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্যের মোট ২২ লক্ষের বেশি পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারকে ১০০ শতাংশ ‘গ্রামীণ রোজগার গ্যারান্টি কার্ড’ বা GRGC-এর আওতায় নিয়ে আসার ঐতিহাসিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে, যোগ্য পরিবারগুলিকে বছরে সুনিশ্চিতভাবে ১২৫ দিনের মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে গোটা রাজ্যজুড়ে জোরকদমে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। বর্তমান রাজ্য প্রশাসনের এই বিশেষ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘ঘরের শ্রমিককে ঘরেই কাজ’-এর সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার প্রবণতা কমানো যায় এবং তাঁদের বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির মূলস্রোতের সঙ্গে পুনরায় শক্তভাবে যুক্ত করা সম্ভব হয়।

শ্রম দফতরের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এবং রাজ্যের ২২টি জেলার ব্যাপক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মোট ২২ লক্ষ ২৪ হাজার ৬০ জন পরিযায়ী শ্রমিককে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনের প্রাথমিক কাজ হলো—জেলা স্তরে কড়া নজরদারির মাধ্যমে যাচাই করা যে কোন কোন পরিযায়ী পরিবার ইতিমধ্যেই এই রোজগার গ্যারান্টি কার্ড হাতে পেয়েছে। পাশাপাশি, যে সমস্ত যোগ্য পরিবার নানা কারণে এখনও পর্যন্ত এই কার্ডের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে সম্পূর্ণ কভারেজ নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র কার্ড বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না প্রশাসন, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি কর্মক্ষম সদস্যের কাজের চাহিদাও নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতেই জেলা প্রশাসনকে দ্রুত উপযুক্ত মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে।

বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘বিকশিত ভারত–G RAM G’ প্রকল্পের বর্তমান রূপরেখা এবং নির্দেশিকা মেনেই গ্রামীণ পরিবারগুলিকে বছরে ১২৫ দিনের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সমন্বিত প্রকল্পকে হাতিয়ার করেই ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের বাংলার গ্রামীণ কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কাজ দ্রুত শেষ করতে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসক, জেলা প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর এবং জিটিএ (GTA)-কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মাঠে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিহ্নিত পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যার দিক থেকে রাজ্যের সমস্ত জেলার মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে মুর্শিদাবাদ জেলা। এই একক জেলাতেই সর্বমোট ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার ১৯১ জন পরিযায়ী শ্রমিককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মালদা জেলা, যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৮৬ হাজার ৩২৯ জন। এছাড়া অন্যান্য প্রধান জেলাগুলির মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরে ১,৬৮,৫৭০ জন, নদিয়ায় ১,৬১,৯০৮ জন, পূর্ব মেদিনীপুরে ১,৫৭,৩৭৬ জন এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১,৫০,৯৮৭ জন শ্রমিককে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে কোচবিহারে ১,৪৪,৯১৬ জন, উত্তর ২৪ পরগনায় ১,২৭,৯৩৬ জন, উত্তর দিনাজপুরে ১,২০,১৬০ জন এবং পূর্ব বর্ধমানে ১,১২,৪৫২ জন পরিযায়ী শ্রমিকের সন্ধান মিলেছে। তুলনামূলক কম সংখ্যার তালিকায় বীরভূমে ৯৫,৯৪৬ জন, হুগলিতে ৬১,১৭৭ জন, হাওড়ায় ৫৯,৪৭৪ জন, পুরুলিয়ায় ৪৯,১৫৬ জন, বাঁকুড়ায় ৩৮,৫০২ জন, জলপাইগুড়িতে ৩০,৭৩১ জন এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৮,৫১৬ জন রয়েছেন। এছাড়া আলিপুরদুয়ারে ১৫,৭৫১ জন, ঝাড়গ্রামে ১০,৬১৮ জন, দার্জিলিংয়ে ১০,০৬৯ জন, পশ্চিম বর্ধমানে ৩,৮৬০ জন এবং কালিম্পঙে ৩,৪৩৫ জন পরিযায়ী শ্রমিককে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই সুদূরপ্রসারী ও জনমুখী পদক্ষেপ পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এক বিশাল পরিবর্তনের দিশা দেখাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty