মা তারার কাছে সবাই সমান! কৌশিকী অমাবস্যার ভিড় নিয়ন্ত্রণের মহা পরিকল্পনায় তোলপাড় ভক্তমহল

হাতে গোনা আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তারপরেই ভাদ্র মাসের সেই পবিত্র ও মাহেন্দ্রক্ষণ—কৌশিকী অমাবস্যা। এই বিশেষ তিথি উপলক্ষে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার বীরভূমের পবিত্রপীঠ তারাপীঠে মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশেষ পুজো ও যজ্ঞ। তবে এবারে কৌশিকী অমাবস্যায় পুণ্যার্থীদের জন্য এক ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী বদল আনতে চলেছে তারাপীঠ মন্দির কমিটি। মন্দির কর্তৃপক্ষের কড়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অমাবস্যার পবিত্র দিনটিতে কোনো ভক্তকেই গর্ভগৃহে প্রবেশ করে পুজো দিতে দেওয়া হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ ভক্তদের পাশাপাশি এই কঠোর নিয়ম একযোগে প্রযোজ্য হবে ভিআইপি, ভিভিআইপি, দেশের বা রাজ্যের বিশিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিক এবং মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও।

পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, এ বছর আগামী ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১১ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে এবং তা শেষ হবে পরদিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। কৌশিকী অমাবস্যার এই মহা লগ্নকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই তারাপীঠজুড়ে জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রতি বছরই এই বিশেষ তিথিতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত, সাধক ও পর্যটকের ঢল নামে। এবারও বিপুল সংখ্যক মানুষের জনসমাগম হবে বলে পূর্ণ আশাবাদী তারাপীঠ মন্দির কমিটি থেকে শুরু করে স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীরা।

এই প্রসঙ্গের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে তারাপীঠ মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদ মাধ্যমকে জানান, “এবারের অমাবস্যায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ ভক্তদের পাশাপাশি ভিআইপি, ভিভিআইপি, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও মন্ত্রীরাও একেবারে সাধারণ মানুষের মতো নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়িয়ে মন্দিরে প্রবেশ করবেন। গর্ভগৃহের বাইরে থেকেই সেদিন মা তারার রূপ দর্শন করতে হবে সকলকে। কাউকে কোনো ধরনের বিশেষ প্রোটোকল লাইন বা অতিরিক্ত সুবিধার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, কৌশিকী অমাবস্যার দিন ভক্তদের সুবিধার জন্য মূলত দুটি লাইন রাখা হবে—একটি ভিআইপি লাইন এবং অন্যটি সম্পূর্ণ সাধারণ লাইন। ভিআইপি লাইনের ক্ষেত্রে মাথাপিছু মাত্র ৫০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে। মন্দির চত্বরের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থেই এই ন্যূনতম অর্থ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে কমিটি। অতীতে হাজার বা দু’হাজার টাকার যে সমস্ত চড়া দামের ভিআইপি লাইন বা বিশেষ পাস ব্যবস্থা থাকত, তা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি, সাধারণ লাইনে পুণ্যার্থীদের দর্শন করার জন্য কোনো ধরনের ফি বা টাকা দিতে হবে না। তবে সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভিআইপি হোক কিংবা সাধারণ লাইন—কোনো লাইনের পুণ্যার্থীই কৌশিকী অমাবস্যার দিন গর্ভগৃহে প্রবেশাধিকার পাবেন না। মন্দির কমিটির দ্ব্যর্থহীন দাবি, মা তারার দরবারে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকলেই সমান। এই পবিব্র ভাবনার কথাই মাথায় রেখেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যার দিনে গর্ভগৃহে পুজো দেওয়ার সময় অতিরিক্ত ভিড় ও তার জেরে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠত। বিশেষ করে ভিআইপি প্রোটোকলের কারণে সাধারণ পুণ্যার্থীদের লাইন দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা এবং দ্রুত দর্শন করিয়ে দেওয়ার নাম করে একশ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগও অতীতে সামনে এসেছে। সেই সমস্ত অসঙ্গতি, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করেই এ বছর কৌশিকী অমাবস্যায় দর্শন ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও জনমুখী করার বড় উদ্যোগ নিয়েছে তারাপীঠ মন্দির কমিটি। প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং মন্দির কমিটির এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে এ বছরের অমাবস্যায় ভক্তদের ভিড় সামলানো অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।