এক পশলা বৃষ্টিতেই ভাসল ‘মিলেনিয়াম সিটি’! গুরুগ্রামের জলমগ্ন রাস্তা নিয়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

মাত্র এক পশলা ভারী বৃষ্টিতেই বেহাল দশা হয়েছে দেশের অন্যতম আধুনিক শহর তথা ‘মিলেনিয়াম সিটি’ গুরুগ্রামের। সামান্য বর্ষাতেই শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় হাঁটুসমান জল জমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও অফিসযাত্রীরা। আর এই জলযন্ত্রণা এবং নাগরিক পরিষেবা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে চরম রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি। একসময়ের প্রাকৃতিক জলনিকাশি নালা নির্বিচারে বুজিয়ে দেওয়ার জন্য সরাসরি প্রাক্তন শাসকদল কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা স্থানীয় বিজেপি সাংসদ রাও ইন্দ্রজিৎ সিং। অন্যদিকে, গত কয়েক বছরে নিকাশি পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা খরচ হওয়া সত্ত্বেও কেন শহরের এই করুণ দশা হলো, তা নিয়ে বিজেপি সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছে কংগ্রেস।

জলযন্ত্রণা ও তার স্থায়ী সমাধান নিয়ে বলতে গিয়ে গুরুগ্রামের চারবারের সাংসদ রাও ইন্দ্রজিৎ সিং বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, জল জমা আটকাতে বর্তমানে যেসব পাম্পিং বা সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেগুলি কেবল সাময়িক মলম লাগানোর মতো। তাঁর মতে, কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালে যত্রতত্র উন্নয়নের নামে আরাবল্লী পর্বতমালা থেকে যমুনায় জল নেমে যাওয়ার পুরনো প্রাকৃতিক নালা ও পথগুলি পুরোপুরি বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর আজকের এই ভয়াবহ জলমগ্ন পরিস্থিতির পিছনে অতীতের সেই ভুল সিদ্ধান্তই প্রধানভাবে দায়ী। তবে রাজনৈতিক মহলে এই তর্কের পাল্টা হিসেবে এটিও মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ২০০৯ সালে ইন্দ্রজিৎ সিং যখন প্রথমবার ওই আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন, তখন তিনি কংগ্রেস দলেই ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং তারপর থেকে রাজ্যে ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রয়েছে বিজেপিই।

এই চিরস্থায়ী জলসমস্যা থেকে পাকাপাকিভাবে মুক্তি পেতে মেট্রোর আদলে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা ড্রেনেজ টানেল তৈরির অভিনব প্রস্তাব দিয়েছেন রাও ইন্দ্রজিৎ। তাঁর পরামর্শ, পুরনো এবং বুজে যাওয়া নালাগুলির পথ অনুসরণ করে যদি মাটির তলা দিয়ে সুপ্রশস্ত ড্রেনেজ টানেল তৈরি করা সম্ভব হয়, তবেই প্রবল বর্ষার জল দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারবে। ইতিমধ্যেই এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্য অর্থ সংগ্রহ ও রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে বিজেপি সাংসদের এই সাফাইকে মানতে নারাজ বিরোধী দল কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় নেতার মন্তব্যের পর বিজেপিকে এক হাত নেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা। তিনি সোজা প্রশ্ন তোলেন, যদি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতির পেছনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা জলের মতো খরচ করা হয়ে থাকে, তবে কেন সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের গোটা পরিকাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল? প্রধান সড়ক ও সুবাস চকের মতো ব্যস্ত এলাকায় জল জমে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া এবং সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তির মুখে পড়ার জন্য তিনি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ প্রশাসনকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৪ অগস্ট সকালের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই সাইবার সিটির বিস্তীর্ণ এলাকা পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সুভাষ চক সংলগ্ন প্রধান সড়কে প্রায় ৯টি স্কুল বাস সহ ১৫টি যাত্রীবাহী গাড়ি গভীর জলে আটকে যায় এবং প্রায় ৩০০ জন খুদে পড়ুয়া দীর্ঘ দুয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। এছাড়া দিল্লি-জয়পুর জাতীয় সড়কের সার্ভিস লেনের একটি অংশ আচমকা ধসে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পরদিন অর্থাৎ ২৫ অগস্ট প্রশাসন বাধ্য হয়ে সমস্ত করপোরেট সংস্থাকে তাদের কর্মচারীদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশিকা জারি করতে বাধ্য হয়।

প্রাকৃতিক দিক থেকে বিচার করলে, গুরুগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে শহরের ঢাল এবং আরাবল্লী পাহাড়ের পাদদেশের অবস্থান একে সহজাতভাবেই জলমগ্নতার ঝুঁকিতে রাখে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরোন্নয়ন, জলাশয় ভরাট এবং শতাব্দীর প্রাচীন প্রাকৃতিক নালাগুলি বুজিয়ে ফেলার ফলেই সামান্য বৃষ্টিতে আজ এই ভয়াবহ মহাবিপদের মুখে পড়তে হয়েছে মিলেনিয়াম সিটির বাসিন্দাদের। এখন দেখার, রাজনৈতিক দড়িটানাটানির বাইরে বেরিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান আদতে কবে বেরিয়ে আসে।