ঘুড়ির পিছু ধাওয়া আর মৃত্যুর ফাঁদ! জাসোলার খোলা নর্দমা থেকে ৩ দিন পর উদ্ধার স্কুলছাত্রের মরদেহ

রাজধানী দিল্লির জাসোলা এলাকায় এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘ তিন দিনের নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে একটি খোলা নর্দমা থেকে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত কিশোরের নাম মিথুন। সে দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির জাসোলা গ্রামের বাসিন্দা এবং অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের জীবন ওলটপালট করে দেয়নি, বরং প্রশাসনের ভূমিকা ও দিল্লির বেহাল নর্দমা ব্যবস্থাপনা নিয়েও এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার সকালে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ১৫ বছর বয়সী মিথুন সেদিন সকালে স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল এবং তার গায়ে স্কুলের ইউনিফর্মও পরা ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে ঘুড়ি উড়তে দেখে কৌতূহলভী হয়ে সে ঘুড়ির পিছু ধাওয়া করে। আর এই সামান্য শিশুসুলভ উন্মাদনাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির কাছেই অবস্থিত একটি অরক্ষিত ও খোলা নর্দমায় সে হঠাৎ পা ফসকে পড়ে যায়। শনিবার সকাল আনুমানিক ১১টা থেকে ১১:৫৪ মিনিটের মধ্যে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ছেলেটি হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার দুপুরেই দিল্লি ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনার খবর দেওয়া হয়। খবর পাওয়া মাত্রই ফায়ার সার্ভিসের দুটি দ্রুতগামী গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকার্য শুরু করে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রশাসনের তরফ থেকে লাগাতার তল্লাশি অভিযান চালানো হলেও প্রথম তিন দিনে কিশোরের কোনো সন্ধান মেলেনি। নর্দমার কালো জল ও আবর্জনার স্তূপের কারণে উদ্ধারকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও নাড়া দেওয়ার মতো দিকটি ছিল এক অসহায় বাবার অন্তহীন যন্ত্রণা। সন্তানকে হারানোর ভয়ে ও ক্ষোভে পাগলপ্রায় বাবা অবধেশ কুমার প্রশাসনের আশ্বাসের অপেক্ষা না করে নিজেই মাঠে নেমে পড়েন। মঙ্গলবার মিথুনের মরদেহ উদ্ধারের কিছুক্ষণ আগের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা দেখে আপামর দেশবাসীর চোখ ভিজে ওঠে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, অবধেশ কুমার খালি হাতেই ওই বিষাক্ত ও নোংরা নর্দমার আবর্জনা সরানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর চোখে-মুখে ছিল চরম আতঙ্ক, হতাশা ও তীব্র বেদনা। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছিলেন যে, নর্দমার এই আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করলেই হয়তো তার কলিজার টুকরো ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এর আগে অন্য একটি ভিডিওতেও তাঁকে একটি লাঠি দিয়ে ময়লার স্তূপে ছেলেকে খুঁজতে দেখা গিয়েছিল। এক বাবার এই বুকফাটা আর্তনাদ ও নর্দমায় নেমে নিজ সন্তানের খোঁজ করার দৃশ্য সাধারণ মানুষের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
অবশেষে দীর্ঘ তল্লাশির পর মঙ্গলবার সকালে জাসোলার সেই খোলা নর্দমা থেকেই মিথুনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, উদ্ধার হওয়া মরদেহটি মিথুনেরই। অষ্টম শ্রেণির এই মেধাবী ছাত্রটির এভাবে মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মিথুনের পরিবার মূলত উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। তার বাবা অবধেশ কুমার জীবিকার তাগিদে বহু বছর ধরে দিল্লির জাসোলা এলাকায় দিনমজুর বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছেন। পেটের টানে শহরে এসে নিজের সন্তানকে এভাবেই হারাতে হবে, তা বোধহয় ওই বাবা কল্পনাও করতে পারেননি।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আর কত প্রাণ গেলে প্রশাসনের টনক নড়বে? রাজধানী দিল্লির বুকে এভাবে খোলা ও অরক্ষিত নর্দমাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত পড়ে থাকার কারণে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। শিশু ও সাধারণ পথচারীদের জীবন নিয়ে এই উদাসীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কীভাবে এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি তরতাজ প্রাণ চলে যাওয়ার পর এই তদন্ত বা শোক প্রকাশের কী মূল্য থাকে? অবধেশ কুমারের খালি হাতে নর্দমা হাতড়ানোর এই ছবি আমাদের শহুরে ব্যবস্থার ব্যর্থতার এক নিষ্ঠুর দলিল হয়ে রইল।