কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার দৌড়! শেয়ার বাজার থেকে মিউচুয়াল ফান্ডে বাড়ছে সাধারণ মানুষের ঝোঁক!

আমাদের দেশের বেশিরভাগ পরিবারের কাছেই সঞ্চয় বলতে প্রথাগতভাবে সোনা কেনা, জমি বা সম্পত্তি নেওয়া, ব্যাঙ্কে টাকা রাখা কিংবা বাড়িতে নগদ অর্থ জমিয়ে রাখাকেই বোঝানো হতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এই চেনা ছবিটাতে এক বিশাল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর পর থেকেই ভারতীয় পরিবারগুলির জমানো টাকা ধীরে ধীরে জমি ও সোনার মতো ঐতিহ্যবাহী সম্পদ থেকে সরে এসে ব্যাঙ্ক আমানত, শেয়ার বাজার এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো আধুনিক আর্থিক উপকরণের দিকে ঝুঁকছে।

জেএম ফিনান্সিয়ালের সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারতীয়দের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা মোট অর্থের পরিমাণ ৯.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৪.৮ লক্ষ কোটি টাকায়। এখানে একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হলো, নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার হার মাত্র ১.৮ শতাংশ বাড়লেও, পুরনো অ্যাকাউন্টগুলিতেই মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে টাকা সঞ্চয় করছেন। বর্তমানে দেশের প্রতিটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গড় জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫১,৪৯৪ টাকায়।

যদি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যায়, তবে দেখা যাবে ২০০৫ সালে ভারতীয় পরিবারের মোট সঞ্চয়ের মাত্র ৩৯.৫ শতাংশ ব্যাঙ্ক, শেয়ার এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের অর্থবর্ষে সেই অনুপাত বেড়ে পৌঁছে গিয়েছে ৪৪.৭ শতাংশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লকডাউনের দীর্ঘ সময়ে মানুষ যখন ঘরে বন্দি ছিলেন, তখন অনলাইন ব্যাঙ্কিং, ডিজিটাল বিনিয়োগ এবং শেয়ার বাজারের কার্যকারিতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন ও বুঝেছেন। মূলত সেই সময় থেকেই সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মানসিকতা এবং অভ্যাসে এই বড় পরিবর্তনটি শুরু হয়েছিল।

এই মানসিকতার বদলের সবচেয়ে বড় ও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে শেয়ার বাজারে। ২০২৬ অর্থবর্ষে দেশে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও আগের বছরের ২৬.৭ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় এই বৃদ্ধির গতি সামান্য মন্থর হয়েছে, তবুও সামগ্রিক হার যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে তো ছবিটা আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এই ধরনের সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৬.৮ শতাংশ বেড়ে একলাফে পৌঁছে গিয়েছে ২৭.৪ কোটিতে। এর অর্থ স্পষ্ট—এখন আর শুধু বড় শিল্পপতি বা ধনী ব্যবসায়ীরাই নন, বরং সাধারণ মধ্যবিত্ত ও ছোট বিনিয়োগকারীরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে শেয়ার বাজারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবেশ করছেন।

তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে ভারত এখনও অনেকটা পেছনে রয়েছে এবং এখানে প্রবৃদ্ধির বিশাল সুযোগ রয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার তুলনায় প্রায় ১৩.১ শতাংশ মানুষের কাছে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তুলনামূলকভাবে চীনে এই অনুপাত ২৮.৩ শতাংশ এবং জাপানে ৩০.২ শতাংশ। অর্থাৎ, ভারতে এখনও কোটি কোটি মানুষ শেয়ার বাজার ও পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছেন। আগামী দিনে তাঁরা যখন বিনিয়োগের দুনিয়ায় পা বাড়াবেন, তখন দেশের আর্থিক বাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

একইভাবে, দেশের মোট অর্থনীতির আকারের তুলনায় মিউচুয়াল ফান্ডের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯.৬ শতাংশে। যেখানে চীনে এই হার ২৮.৭ শতাংশ, জাপানে ৪৩ শতাংশ এবং আমেরিকায় তা সর্বোচ্চ ৭৬.৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে ভারতের বিনিয়োগের গল্প সবেমাত্র শুরু হয়েছে এবং এর সম্প্রসারণের জন্য এখনও বিরাট বাজার ফাঁকা পড়ে রয়েছে।

এই পুরো আর্থিক পরিবর্তনের ধারায় দেশের নারীরাও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, নারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা এবং সেই অ্যাকাউন্টগুলিতে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ পুরুষদের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অর্থ হলো, ভারতীয় পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। একটি পরিবারের আর্থিক চিত্র বদলানোর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ নিয়ে মানুষের এই পরিবর্তিত অভ্যাসই প্রমাণ করে যে আগামী দিনে ভারতের আর্থিক কাঠামো আরও বেশি শক্তপোক্ত হতে চলেছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty