রাগের বাজারে হুলস্থুল! সেলিব্রেশন থেকে কাউন্সেলিং—অনির্ধারিত এক অদ্ভুত স্কুলের অন্দরমহলে কী ঘটছে?

এক অদ্ভুত এবং অভিনব ‘অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট’ প্রতিষ্ঠান। যেখানে নিজেদের ব্যক্তিগত মানসিক টানাপোড়েন এবং আবেগজনিত সমস্ত সমস্যার সমাধানের আশায় এসে উপস্থিত হয় তিনজন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। রিসেপশনিস্ট এবং পরবর্তীতে কাউন্সেলরের সঙ্গে তাদের একের পর এক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে তাদের ব্যক্তিগত হতাশা, অবদমিত আবেগ এবং জীবনের নানা অপ্রকাশিত সত্য। প্রশ্ন জাগে, এরপর ঠিক কী ঘটে?

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় কলকাতার মঞ্চে আসতে চলেছে নতুন বাংলা নাটক ‘তারাময়ী অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট স্কুল’। এটি নিছক কোনো সাধারণ নাটক নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যঙ্গনাট্য, যেখানে সমকালীন সমাজের তীব্র মানসিক অস্থিরতা, ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং তীব্র আবেগের সংকটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু পরিস্থিতি, শক্তিশালী প্রতীকী চরিত্র এবং বহুমাত্রিক অভিনয়ভাষার মাধ্যমে নাটকটি এগিয়ে চলে। এই অনন্য নাট্যজগতে হাস্যরস এবং অস্বস্তি একে অপরের পাশাপাশি অবস্থান করে। ক্রোধ, বিভ্রান্তি, হতাশা এবং মানসিক ক্লান্তি কীভাবে ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য ও অবধারিত অংশ হয়ে উঠছে, এই নাটকটি তারই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি বলে দাবি করেছেন নির্দেশক অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।

পরিচালকের মতে, গল্পের সূচনা দেখে প্রথমে এটিকে একটি সাধারণ কাউন্সেলিং সেশন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা ক্রমশ রূপ নেয় মানুষের অস্তিত্ব ও সমাজব্যবস্থাকে ঘিরে এক গভীর এবং নির্মম অনুসন্ধানে। পরিচয় সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জীবনের টিকে থাকার কঠোর সংগ্রাম—সবকিছুই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উঠে আসে সেই কথোপকথনের পরতে পরতে। তীক্ষ্ণ রসবোধ, অন্ধকার হাস্যরস, শ্লেষাত্মক ব্যঙ্গ এবং তীব্র সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকটি আধুনিক মানুষের ক্রোধের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক শিকড়কে নিপুণভাবে অনুসন্ধান করে।

নাটক যত সামনের দিকে এগোতে থাকে, তার ভাষা ও আবহ ধীরে ধীরে বদলে যায়। শুরুতে যে হাস্যরস এবং অতিরঞ্জনের হালকা আবরণ দেখা যায়, তা ক্রমশ সরে গিয়ে উন্মোচিত করে এক গভীরতর এবং রুঢ় বাস্তবতা। ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে বৃহত্তর সমাজের এক সম্মিলিত হতাশার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যেখানে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক বিপর্যয়ের চক্রব্যূহের মধ্যে প্রতিনিয়ত আটকে পড়ছে। কোনো ধরনের সরাসরি উপদেশ বা প্রচারমূলক বক্তব্য জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে, ‘তারাময়ী অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট স্কুল’ আসলে দর্শকদের সামনে বর্তমান সময়ের একটি নিখাদ আয়না তুলে ধরে। এটি এমন এক প্রজন্মের আয়না, যারা ক্রমশ এমন এক বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শব্দ, সংঘাত এবং মানসিক ক্লান্তিই প্রতিদিনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ব্যতিক্রমী নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনয়ে দেখা যাবে অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সাগ্নিক, সৌরভ চক্রবর্তী, শম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুরাধা বসু, সুদেষ্ণা পাল এবং দেবজ্যোতি পালকে। নাটকটির মূল গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন স্বয়ং অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। এর সামগ্রিক ভাবনা, মঞ্চের নকশা ও নির্দেশনার দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি। সহকারী নির্দেশনার দায়িত্বে রয়েছেন পম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রোডাকশন ডিজাইন করেছেন তরুণ কুমার সিং ও মলয় মণ্ডল। সঙ্গীত পরিকল্পনা করেছেন অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, আলোক পরিকল্পনায় রয়েছেন বাবলু সরকার, শব্দ পরিকল্পনায় সৌমেন দত্ত, এবং রেকর্ডিং ও মিক্সিংয়ের দায়িত্ব সামলেছে আপটেম্পো সাউন্ড স্টুডিয়ো। নাটকের গানে কন্ঠ দিয়েছেন প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও মোহিনী মণ্ডল। মঞ্চসজ্জার দায়িত্বে রয়েছেন অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, আর রূপসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনা করেছেন পম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরো প্রযোজনাটির নেপথ্যে রয়েছেন প্রযোজক টি.কে সিং।