ডার্ক ওয়েব থেকে তথ্য চুরি! বালিগঞ্জের গোপন আস্তানা থেকে ধৃত চার, উদ্ধার ল্যাপটপ ও ফোন

বালিগঞ্জের একটি বিলাসবহুল বাড়িতে গোপনে ভুয়ো কল সেন্টার চালিয়ে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর্দাফাঁস করল কলকাতা পুলিশ। টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কর্মী পরিচয় দিয়ে মূলত ব্রিটেনের নাগরিকদের ফোন করা হতো। ওয়্যারলেস ডেটা পরিষেবা, সিম কার্ডের সমস্যা সমাধান কিংবা কাস্টমার কেয়ারের ভুয়ো নাম করে গ্রাহকদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্কিং তথ্য ও পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম থানা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বালিগঞ্জের একটি এলাকায় সন্দেহজনক কল সেন্টার চালানোর বিষয়ে সম্প্রতি গোপন সূত্রে খবর আসে। এরপর প্রযুক্তিগত তথ্য নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ এবং সত্যতা যাচাই করার পর গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ সেখানে আচমকা অভিযান চালায়। ঘটনাস্থল থেকেই তিনজনকে হাতেহাতে পাকড়াও করা হয়। তল্লাশিতে একাধিক হাই-এন্ড ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং দামি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই তদন্তের সূত্র ধরেই তালতলা এলাকা থেকে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত চার অভিযুক্তের নাম— ফিরদৌস ইকবাল (৩৬), শেখ সাজ্জাদ (৩৬), রূপম টিমোথি বিশ্বাস (২৩) এবং শব্বির আলম (৪৭)।
তদন্তকারীদের দাবি, এই চক্রে খুব বড় কোনো কর্মী বাহিনী কাজ করত না, বরং অল্প কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে সুচারুভাবে পুরো নেটওয়ার্কটি চালানো হতো। তবে অভিযুক্তদের মধ্যে বিশেষ করে কিছু সদস্যের বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে নিখুঁতভাবে ইংরেজি বলার এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলার বিশেষ অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ছিল। কীভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং তাঁদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য বের করে নিতে হবে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ প্রশিক্ষিত ছিল। সাধারণ মোবাইল ফোনের পরিবর্তে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে বিশেষ ভিওআইপি (VOIP) অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে সরাসরি বিদেশে ফোন করা হতো, যাতে কল সেন্টারের প্রকৃত অবস্থান বা পরিচয় সহজে গোপন রাখা যায়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই প্রতারণার মাধ্যমে ব্রিটিশ পাউন্ড এবং মার্কিন ডলারে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের অনুমান, এই চক্রের মূলচক্রী বিহারের বাসিন্দা। বিদেশি নাগরিকদের ফোন করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘লিড’ বা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবের মতো অবৈধ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হতো। বাজেয়াপ্ত করা ল্যাপটপ ও ডিভাইসগুলির ফরেন্সিক পরীক্ষা করে এই তথ্যের উৎস এবং এই আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য মাথাদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। প্রতারিত বিদেশি নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, হাতিয়ে নেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ এবং সেই অর্থ কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা কোথায় পাচার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। প্রয়োজনে এই ঘটনার তদন্তে আয়কর দফতর ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর সাহায্য নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।