কেরোসিনের আলো থেকে আইএএস! অভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে ইতিহাস গড়লেন বিহারের এই তরুণ?

স্বপ্ন দেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা অনুকূল পরিবেশ লাগে না—এই আপ্তবাক্যটি ফের একবার প্রমাণ করলেন বিহারের বক্সার জেলার নওয়ানগর গ্রামের অঙ্কুশ ওরফে অংশুমান রাজ। চরম দারিদ্র্য, পড়াশোনার মতো ন্যূনতম সুযোগের অভাব কিংবা একের পর এক ব্যর্থতা—কোনো কিছুই তাঁর লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি। কেরোসিনের বাতির আলোয় পড়াশোনা করা সেই সাধারণ গ্রাম্য ছেলেই আজ দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা ইউপিএসসি (UPSC) জয় করে IAS অফিসারের আসনে আসীন। ২০১৯ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ১০৭ র্যাঙ্ক করে তিনি এখন লক্ষ লক্ষ বেকারের অনুপ্রেরণা।
সংগ্রামের কঠিন পথ
অংশুমানের এই সাফল্যের পথটি মোটেও ফুলশয্যা ছিল না। ২০০২ সালে তাঁর বাবার চালকল ব্যবসায় বিপুল ক্ষতির পর তাঁদের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বাবা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এই চরম সংকটের দিনে পরিবারের হাল ধরেন তাঁর মা। তিনি একজন ‘শিক্ষা মিত্র’ হিসেবে মাত্র ১৫০০ টাকা বেতনে চাকরি করার পাশাপাশি সংসার টানতে একটি ছোট বিউটি পার্লার চালাতেন। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন অংশুমান নিজেও।
চাকরির ফাঁকেই লড়াই
২০১৩ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর তিনি হংকং-এর একটি সংস্থায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি নেন। কিন্তু আইএএস (IAS) হওয়ার জেদ এতটুকুও কমেনি। জাহাজে একটানা ছয় মাস কাজ করার পর যে তিন মাস ছুটি পেতেন, সেই সময়টাকেই তিনি প্রস্তুতির একমাত্র হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। দিল্লির কোনো নামী দামি কোচিং সেন্টারে পড়ার আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। যৌথ পরিবারের কোলাহল থেকে দূরে থেকে পড়ার জন্য তিনি ভাইয়ের কাছে হলদিয়ায় চলে যেতেন।
ধাপে ধাপে এসেছে বাধা। ২০১৬ সালে প্রথমবার প্রিলিমস পাস করলেও মেইনসে অল্পের জন্য আটকে যান। ২০১৭ সালে ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছালেও ব্রাজিলে কাজের ব্যস্ততার কারণে শেষরক্ষা হয়নি। এমনকি ২০১৮ সালের মেইন পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হয়েও তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে পরীক্ষা দেন। সেই বছরই তিনি আইআরএস (IRS) পদে নির্বাচিত হন। কিন্তু নিজের স্বপ্ন ছোঁয়া বাকি থাকায় তিনি থেমে থাকেননি। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালে ফের পরীক্ষা দিয়ে ১০৭ র্যাঙ্ক অর্জন করে নিজের কাঙ্ক্ষিত IAS পদটি ছিনিয়ে নেন।
অংশুমানের এই অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে দেয় যে, সাফল্যের জন্য নিখুঁত বা বিলাসবহুল পরিবেশের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কেবল অটুট জেদ আর সঠিক ইচ্ছাশক্তির।