মোঘলরা তুর্কি ছেড়ে কেন ফারসিকে বানাল সাম্রাজ্যের ভাষা? জানুন ইতিহাসের চমকপ্রদ সত্য

মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষার ব্যবহার ও এর আধিপত্য নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক নতুন কিছু নয়। আঞ্চলিক দলগুলোর হাত ধরে ভাষাগত সংঘাতের ইতিহাস থাকলেও, সাম্প্রতিককালে মহারাষ্ট্র সরকারের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এই বিতর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। রাজ্য সরকারের নতুন কড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে রাজ্যের বাণিজ্যিক অটো-রিকশা এবং ট্যাক্সি চালকদের জন্য মারাঠি ভাষার কার্যকরী জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেকোনো সময় সরকারি আধিকারিকরা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চালকদের মারাঠি ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন এবং এই নিয়মের অন্যথা হলে কড়া প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
এই সমসাময়িক ভাষাগত বিতর্ক এবং ক্ষমতার রাজনীতির মূল শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাসের পাতায়। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ও তাঁর উত্তরসূরিরা মূলত মধ্য এশিয়ার চাগাতাই তুর্কি ঐতিহ্য থেকে এসেছিলেন। তুর্কি তাঁদের মাতৃভাষা হলেও তাঁরা নিজেদের সুবিশাল সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক কাজকর্ম, কূটনীতি এবং সাহিত্যের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভাষা—ফারসিকে বেছে নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও তথ্যাবলি থেকে পরিষ্কার যে, তুর্কি ভাষা থেকে উদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ফারসি ধাপে ধাপে মুঘল রাজদরবারের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছিল এবং তা ভারতের সমগ্র ভাষাগত পরিমণ্ডলকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বাবর তাঁর বিশ্বখ্যাত আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’ মূলত চাগাতাই তুর্কি ভাষাতেই রচনা করেছিলেন এবং তাঁর রাজপরিবারের অন্দরেও তুর্কি ভাষার ব্যাপক চল ছিল। তবে মধ্য এশিয়া ও ইসলামি বিশ্বে ফারসি কেবল একটি সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল উচ্চ সংস্কৃতি, কূটনীতি এবং পরিশীলিত প্রশাসনিক দক্ষতার চরম প্রতীক। মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানে ফারসি ভাষা ইউরোপের লাতিন বা ভারতের সংস্কৃত ভাষার সমকক্ষ সাংস্কৃতিক মর্যাদা ভোগ করত। তুর্কি ভাষা দৈনন্দিন কথোপকথনের জন্য সহজ হলেও একটি সুবিশাল সাম্রাজ্যের জটিল হিসাবনিকাশ, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফারসির সুসংগঠিত শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণগত শৃঙ্খলা ছিল অপরিহার্য।
মুঘল প্রশাসনে ফারসি ভাষাকে পাকাপাকিভাবে বাধ্যতামূলক করার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব সম্রাট আকবর এবং তাঁর মেধাবী অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমলের। ১৫৮০-এর দশকে আকবর ফারসিকে সাম্রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজা টোডরমলের রাজস্ব সংস্কারের হাত ধরে ভূমি পরিমাপ, কর আদায় এবং আর্থিক হিসাব রাখার সমস্ত নথি কেবল ফারসিতে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই সুদূরপ্রসারী নীতির ফলে কেবল মুসলিম আধিকারিকরাই নন, বরং কায়স্থ, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও দ্রুত ফারসি আয়ত্ত করে উচ্চ প্রশাসনিক পদ দখল করেছিলেন। এমনকি আকবরের আমলেই চাগাতাই তুর্কি থেকে মহাভারত ও রামায়ণের মতো সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনূদিত হয়েছিল।
ফারসি ভাষা গ্রহণের পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণও কম ছিল না। তুর্কি ভাষা একটি নির্দিষ্ট উপজাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তা দরবারের অন্দরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দিতে পারত। এর বিপরীতে ফারসি ছিল একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক ভাষা, যা বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের রাজসভাসদদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। শত শত বছর ধরে মুঘল আমলের এই প্রভাব ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলোকেও গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। পরবর্তীকালে মারাঠা সাম্রাজ্যের সুবর্ণযুগে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ ফারসি শব্দের দাপট কমাতে ‘রাজ্য ব্যবহার কোষ’ প্রণয়নের নির্দেশ দিলেও, বহু আইনি ও প্রশাসনিক পরিভাষা আজও বাংলা, গুজরাটি ও মারাঠির মতো আঞ্চলিক ভাষায় স্থায়ীভাবে থেকে গেছে।