যেখানে বসেই হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ লিখেছিলেন নেতাজি! আজ চরম অবহেলায় ধুঁকছে কার্শিয়ংয়ের সেই ঐতিহাসিক বাংলো

কার্শিয়ংয়ের গিদ্দা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত বাংলোটি কেবল একটি সাধারণ পাহাড়ি শৈলনিবাস নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক পবিত্র ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সাক্ষী। ১৯২২ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু ব্রিটিশ অফিসার পিটার লেসলির কাছ থেকে এই বাড়িটি কিনেছিলেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত দুর্গাপুজো কিংবা পয়লা বৈশাখের ছুটিতে বসু পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত এখানে আসতেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ঘুরে শিশুদের বিস্কুট-চকলেট বিতরণ কিংবা পাগলাঝোরার ধারে প্রাতঃভ্রমণ—সব মিলিয়ে দার্জিলিং পাহাড়ের সঙ্গে বসু পরিবারের এক আত্মিক যোগ ছিল। কিন্তু এই নিভৃত বাংলোটি প্রকৃত অর্থে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে ১৯৩৬ সালে।

ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে বিপ্লবের নীলনকশা

১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার নেতাজিকে গিদ্দা পাহাড়ের এই বাংলোতে ছ’মাসের জন্য গৃহবন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার কড়া পাহারাও সুভাষচন্দ্র বসুর অদম্য জেদ দমাতে পারেনি। নিজের বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী কালু সিং লামার মাধ্যমে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি একের পর এক বিপ্লবী পরিকল্পনা সফল করেছেন। কালু সিং লামার জুতোর সোলে, পাউরুটির ভিতরে কিংবা পাঞ্জাবির কলারে লুকিয়ে কলকাতার বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে যেত নেতাজির গোপন নির্দেশাবলী।

এমনকি এখানেই তিনি স্ত্রী এমিলি শেঙ্কলকে একাধিক চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি ‘বন্দেমাতরম’ বিতর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জওহরলাল নেহরুকে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিও লিখেছিলেন। ইতিহাস বলে, ১৯৩৮ সালের ঐতিহ্যবাহী হরিপুরা কংগ্রেসের সেই কালজয়ী ভাষণের রূপরেখাও নেতাজি এই গৃহবন্দি অবস্থাতেই তৈরি করেছিলেন।

চরম উদাসীনতা ও বেহাল দশা

১৯৯৬ সালে রাজ্য সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে ২০০১ ও ২০০৫ সালে সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে ‘নেতাজি মিউজিয়াম অ্যান্ড সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন হিমালয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ হিসেবে গড়ে তোলে। তবে বর্তমান চিত্রটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘ এক যুগ ধরে কোনো ধরনের মেরামত না হওয়ায় মূল বাংলো ও মিউজিয়াম আজ জরাজীর্ণ। দেওয়ালের রঙ চটে গেছে, ফেন্সিং ভেঙে পড়েছে এবং বন্ধ হয়ে রয়েছে সমস্ত গবেষণার কাজ। উপরন্তু, পর্যাপ্ত কর্মী না-থাকায় মিউজিয়াম পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মিউজিয়ামের ইনচার্জ গণেশ প্রধান আক্ষেপের সুরে জানান, “সিপিএম সরকারের আমলে যখন এটি তৈরি হয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল এটা মিউজিয়াম ও রিসার্চ সেন্টার হবে। গত কয়েক বছরে গবেষণার কাজ প্রায় বন্ধ বললেই চলে। বাংলোয় মেরামতি ও ফেন্সিংয়ের কাজ জরুরি, সঙ্গে কর্মী পেলে খুব ভালো হতো।” পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে ও প্রচারের প্রসার ঘটাতে আরও উদ্যোগী হওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি।

হিমালয়ান হসপিটালিটি ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল ও ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস মৈত্র উভয়েই একসুরে জানিয়েছেন, নেতাজি সম্পর্কে জানতে হলে গিদ্দা পাহাড়ের এই মিউজিয়াম অপরিহার্য। তাই এর সংস্কার ও পর্যটন মানচিত্রে উপযুক্ত প্রচারের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েরই যৌথভাবে এগিয়ে আসা উচিত।