ভোটার লিস্টে স্বামীর নাম থাকলেই কি বৈধ বিয়ে? ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বড় বার্তা দিল পাটনা হাইকোর্ট!

ভোটার তালিকা, আধার কার্ড বা রেশন কার্ডে স্বামীর নাম থাকার অর্থ এই নয় যে আইনিভাবে বৈধ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি পাটনা হাইকোর্ট এক মামলার শুনানিতে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেছে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, ভোটার লিস্টে কোনো মহিলার নামের পাশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ থাকলেই তা বিয়ের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। যদি বিবাহের বৈধতা নিয়ে কোনো আইনি প্রশ্ন ওঠে, তবে সংশ্লিষ্ট মহিলাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বিয়ে প্রচলিত আইন এবং পারিবারিক বা সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কিনা।
সাধারণত সরকারি নথিপত্র এবং পরিচয়পত্রগুলিকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের আইনি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাটনা হাইকোর্ট এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক টেনে দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে যে, হিন্দু বিবাহ আইনের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের সঠিক স্বীকৃতির জন্য সিঁদুরদান এবং অগ্নিসাক্ষী রেখে সাত পাক বা সাতটি প্রদক্ষিণ সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এই মামলার প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছিল মুজফ্ফরপুরের বাসিন্দা দুর্গাবতী দেবীর জীবনকে কেন্দ্র করে। ১৯৯০ সালের ২২ মে সুরেশ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাঁদের দুটি সন্তানও ছিল। ১৯৯৭ সালে সুরেশের মৃত্যুর পর, ২০০২ সালে পরিবারের চাপে মৃত স্বামীর ছোট ভাই সচিতার সঙ্গে দুর্গাবতীর ফের বিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর থেকেই শুরু হয় পারিবারিক অশান্তি ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, যার জেরে দুর্গাবতীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে তিনি সিওয়ান ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করেন এবং আদালত তাঁকে মাসিক এক হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ২০০৫ সালে সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সচিতা পাটনা হাইকোর্টে যান। পরবর্তীতে সচিতা সিওয়ান ফ্যামিলি কোর্টে টাইটেল স্যুট দায়ের করে দাবি করেন যে তাঁদের মধ্যে কোনো বৈধ বিয়েই হয়নি। নিম্ন আদালত সচিতার পক্ষে রায় দিয়ে জানায় যে দুর্গাবতী তাঁর আইনি স্ত্রী নন। ফ্যামিলি কোর্টের সেই রায়কেই চ্যালেঞ্জ করে দুর্গাবতী দেবী পাটনা হাইকোর্টে আবেদন জানান, যা সম্প্রতি আদালত খারিজ করে দিয়েছে।
বিচারপতিদের বেঞ্চ ব্যাখ্যা করেছে যে ভোটার তালিকার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার এবং পরিচয় নিশ্চিত করা, এটি কোনো বিবাহ সম্পাদনের আইনি দলিল নয়। হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ৭ অনুযায়ী, হিন্দু বিবাহ তখনই সম্পূর্ণ বলে গণ্য হয় যখন উভয় পক্ষের প্রচলিত প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠান মেনে সপ্তপদী বা সাত পাক সম্পন্ন হয়। ফলে, বিবাহ যখন নিজেই চরমভাবে বিতর্কিত, তখন কেবল ভোটার তালিকার মতো circumstantial বা পারিপার্শ্বিক নথির ওপর ভিত্তি করে বৈধ বিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তবে আদালত এও জানিয়েছে যে ভোটার তালিকায় নাম থাকা সম্পূর্ণ অর্থহীন নয়, কিন্তু বিয়ের প্রমাণ দিতে গিয়ে আচার-অনুষ্ঠান, পুরোহিত, তারিখ ও স্থান সংক্রান্ত জোরালো প্রমাণের অনুপস্থিতিতে শুধুমাত্র এই কাগজগুলির ওপর নির্ভর করা যায় না।
এই রায়ের পাশাপাশি পাটনা হাইকোর্টের ঠিক আগেই, ২০২৬ সালের জুন মাসে গুজরাত হাইকোর্টও এক যুগান্তকারী রায়ে জানিয়েছিল যে কেবল ম্যারেজ সার্টিফিকেট বা আইনি রেজিস্ট্রেশন থাকলেই হিন্দু বিবাহ বৈধ হয়ে যায় না, যদি না প্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান সঠিকভাবে পালিত হয়। তবে বিচারকদের মতে এই ধরনের রায়গুলি প্রধানত হিন্দু বিবাহ আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্ট বা বিশেষ বিবাহ আইনের আওতায় সম্পন্ন হওয়া কোর্ট ম্যারেজের ক্ষেত্রে এর নিয়ম আলাদা।