‘অনিচ্ছাকৃত মন্তব্যে আঘাত পেলে দুঃখিত!’ নেতাজি অবমাননা কাণ্ডে সুর নরম করে কী সাফাই দিলেন অনন্ত মহারাজ?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে করা বেশ কিছু বিতর্কিত ও অবমাননাকর মন্তব্য ঘিরে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এই তীব্র সমালোচনার আবহে এবং রাজ্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ঠিক পরেই নিজের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসে অবশেষে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায়, যিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ‘অনন্ত মহারাজ’ নামে সমধিক পরিচিত।

উল্লেখ্য, গত বুধবার নেতাজি সংক্রান্ত এক মন্তব্যের জেরে রাজ্য সরকার তড়িঘড়ি তাঁর নাম থেকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান কেড়ে নেয়। এই সরকারি সিদ্ধান্তের পরেই নড়েচড়ে বসেছেন ওই বিতর্কিত নেতা। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে অনন্ত মহারাজ নিজের ভুল স্বীকার করে জানান, “নেতাজি সম্পর্কে আমার অনিচ্ছাকৃত কিছু বক্তব্যের জন্য যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”

নিজেকে কোচবিহারের মহারাজা বলে দাবি করা এই বিজেপি সাংসদ বিগত কিছুদিন ধরে দলের অবস্থান এবং খোদ নেতাজির ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার বেফাঁস ও বিতর্কিত মন্তব্য করে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন। তাঁর এই ধরণের ধারাবাহিক মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো হয়ে ওঠে যে, সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের একাধিক বিধায়ক ও মন্ত্রী সরাসরি এই বিষয়ে সরব হন এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হয়ে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে গত বুধবারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, মহানায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে যে বা যাঁরা বিন্দুমাত্র অসম্মানজনক মন্তব্য করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসন চরম ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মুখ্যমন্ত্রী শুধু সতর্ক করেই থেমে থাকেননি, প্রয়োজনে অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশও দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, “মন্ত্রী-সান্ত্রী কিংবা সাংসদ, পদ যাই হোক না কেন, দোষী প্রমাণিত হলে পুলিশ কাউকে ছাড়বে না; আমি খোদ পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছি অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই কঠোর হুঁশিয়ারির পরেই প্রশাসন অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে গ্রেটার নেতা তথা ওই বিজেপি সাংসদের দুই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বৃহস্পতিবারই কোচবিহার জেলা পুলিশ গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসে।

অন্যদিকে, এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই নিউ আলিপুরের ৮১ নম্বর ওয়ার্ডে একটি নতুন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। বুধবার রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু দুষ্কৃতী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি আবক্ষ মূর্তির ডানহাত ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ তোলে বিজেপি শিবির। এই ধরনের একের পর এক ঘটনা এবং মূর্ত ভাঙচুরের খবর সামনে আসতেই পরিস্থিতি আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ইতিপূর্বেই মুখ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বাংলার পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে নেতাজির প্রতি কোনো ধরনের অবমাননা বা খারাপ মন্তব্য কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। পুলিশ প্রশাসনকে সমস্ত প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আর ঠিক এই বহুমুখী চাপে পড়েই অবশেষে বঙ্গভূষণ সম্মান হারানোর পর নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলেন অনন্ত মহারাজ। নেতাজি কাণ্ড ঘিরে রাজ্য রাজনীতির এই তীব্র সংঘাত আগামী দিনে কোন মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।