সকালে ঘুম থেকে উঠলেই পায়ে তীব্র বিদ্যুৎ চমক? সাবধান! অবহেলা করলেই পঙ্গু হতে পারেন!

সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর যদি মনে হয় পায়ের মধ্যে দিয়ে যেন তীব্র কারেন্ট বয়ে যাচ্ছে বা কোমর থেকে টান মেরে সেই excruciating ব্যথা একেবারে পায়ের আঙুল পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, তবে সাবধান হওয়ার সময় এসে গেছে। অনেকেই একে স্রেফ পেশির মোচড় বা ক্যালসিয়ামের অভাব ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এর আসল ও মারাত্মক কারণটি লুকিয়ে রয়েছে কোমরের ভেতরে থাকা সায়াটিক নার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ফলে। মানবদেহের দীর্ঘতম এই নার্ভটি কোমর থেকে শুরু হয়ে পা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, যা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।
সায়াটিকা মূলত কেন হয়? আমাদের কোমরের হাড়ের মাঝখানে থাকা ডিস্ক বয়স বাড়লে, ভারী জিনিস তুললে কিংবা দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে স্থানচ্যুত হয়ে যায়। এই সরে যাওয়া ডিস্কটি যখন সায়াটিক নার্ভের উপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে, তখনই শুরু হয় তীব্র যন্ত্রণার আদিপর্ব। এটি সাধারণ কোনো মাসলের ব্যথা নয়, এটি হলো সরাসরি স্নায়ুর বা নার্ভের ব্যথা। ফলে সাধারণ পেইনকিলার বা ব্যথার ওষুধ খেয়ে এই ব্যথা সহজে কমাতে চান না বিশেষজ্ঞরা।
আপনার শরীরে সায়াটিকা বাসা বেঁধেছে কি না, তা বোঝার জন্য ৫টি প্রধান লক্ষণ খেয়াল করা জরুরি:
প্রথমত, সাধারণত শরীরের যেকোনো একটি দিকের পায়ে এই ব্যথা শুরু হয়। ব্যথাটি কোমর বা নিতম্ব থেকে উৎপন্ন হয়ে থাই, হাঁটুর পিছন দিক দিয়ে সোজা পায়ের পাতা পর্যন্ত নেমে যায়। একসঙ্গে দুটি পায়ে এই ব্যথা হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
দ্বিতীয়ত, পায়ে হঠাৎ বৈদ্যুতিক শট লাগার মতো অনুভূতি বা তীব্র জ্বালাপোড়া ব্যথা অনুভূত হওয়া। অনেকে একে পিঁপড়ের কামড় বা পায়ে আগুন লাগার অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে নার্ভ পেইন বলা হয়।
তৃতীয়ত, একটানা বেশিক্ষণ বসলে, হাঁচি দিলে বা কাশি হলে কোমরে মারাত্মক মোচড় দিয়ে ব্যথা বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। চেয়ারে মাত্র ১০ মিনিটও শান্তিতে বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, পা ক্রমাগত ঝিমঝিম করা, অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা পায়ে প্রয়োজনীয় জোর না পাওয়া। বিশেষ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় বা পায়ের আঙুল তুলতে গিয়ে চরম কষ্ট হওয়া।
পঞ্চম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো রাতের বেলা ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটা। যে পায়ে ব্যথা রয়েছে, সেই পাশ ফিরে শুলেই তীব্র যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে যায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন এবং কী করবেন?
যদি এই ব্যথা একটানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, পা অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা প্রস্রাব-পায়খানা ধরে রাখতে সমস্যা দেখা দেয়, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে অবিলম্বে নিউরোলজিস্ট বা অর্থোপেডিক ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আসল কারণ উদঘাটনের জন্য এমআরআই (MRI) পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
বাড়িতে বসে প্রাথমিক সুরক্ষার জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা দরকার:
১. একনাগাড়ে বেশিক্ষণ চেয়ারে বসে থাকবেন না। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর উঠে অন্তত ২ মিনিট হেঁটে নিন।
২. কোনো অবস্থাতেই হঠাৎ করে ভারী জিনিস তুলবেন না। যদি তুলতেই হয়, তবে কোমর বাঁকিয়ে নয়, হাঁটু ভেঙে তুলুন।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হালকা কিছু স্ট্রেচিং যেমন ‘Piriformis Stretch’ এবং ‘Knee to Chest’ এক্সারসাইজ করতে পারেন, যা দারুণ উপকার দেয়।
৪. সেঁক দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম দুই দিন ঠান্ডা সেঁক এবং পরবর্তীতে গরম সেঁক ব্যবহার করা উচিত।
সবশেষে মনে রাখা ভালো যে সায়াটিকার জন্য সবসময় সার্জারির প্রয়োজন হয় না। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক ফিজিওথেরাপি এবং নিয়মমাফিক ওষুধেই রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই পায়ের এই সাধারণ ব্যথাকে কখনো অবহেলা করবেন না, কারণ এই ব্যথার আসল রিমোট কন্ট্রোলটি লুকিয়ে রয়েছে আপনার কোমরই!