নেতাজীকে ‘দেশদ্রোহী’ মন্তব্যে তীব্র ঝড়! অনন্ত মহারাজকে নিয়ে কড়া পদক্ষেপের হুংকার মুখ্যমন্ত্রীর

ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা জাতীয় নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অবমাননাকর পোস্ট ছড়ানোর অভিযোগে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই চরম শোরগোল শুরু হয়েছে। শাসক দলের অন্দরেও এই ধরনের আচরণ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঠিক এইরকম এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নেতাজির অবমাননার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, নেতাজির মতো মহান নেতার অবমাননা করলে কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট কঠোর ধারায় অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রত্যক্ষ হুঁশিয়ারির পরেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন স্বয়ং বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ ওরফে নগেন্দ্র রায়।
বৃহস্পতিবার নবান্নের সভাঘর থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠক করে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কোনো ধরনের অপমানজনক মন্তব্য বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিকর পোস্ট বরদাস্ত করা হবে না। এই ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কড়া আইনি পদক্ষেপ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে বলেও জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর এবিপি আনন্দের পক্ষ থেকে অনন্ত মহারাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, উনি আসলে কোন ইস্যুতে এই কথাগুলো বলছেন। উনি তো সরাসরি আমার নাম নেননি, তবে ‘সাংসদ’-এর কথা বলেছেন। রাজ্যসভায় বা লোকসভায় সাংসদ তো শমীক ভট্টাচার্যও রয়েছেন। তাহলে কি আমাকেই অ্যারেস্ট করা হবে?”
উল্লেখ্য, এর আগে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে ‘দেশদ্রোহী’ শব্দ ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছিল অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি এখনও কি নিজের সেই অবস্থানেই অনড় রয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “আমি কেন এই বক্তব্যের দায় নেব বা একমত থাকব! এই তথ্য তো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আমি যা বলেছি, তার সমস্ত তথ্য বা প্রমাণ ভারত সরকারের আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা বিভাগের বইতেই স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে।” তাহলে কেন তিনি নেতাজীকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিলেন—এই বিষয়ে স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আরে ভাই, এই কথাগুলো তো আমি নিজে থেকে বানিয়ে বলিনি, কাগজ বলছে। সেসময়ের ঐতিহাসিক নথিতে তাঁকে যুদ্ধাপরাধী বলা হয়েছে। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহরু। এই সমস্ত মন্তব্য বা কথাবার্তা তো মূলত কংগ্রেস আমলের! আমাদের বর্তমান সরকার তো বিজেপি সরকার। সুতরাং এই তথ্যের সত্যতা বা অসত্যতা একমাত্র কংগ্রেস দলই বলতে পারবে।”
নেতাজিকে নিয়ে লাগাতার এই অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে রাজ্যজুড়ে বিরোধীরা তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। এই বিষয়ে গতকাল প্রশ্ন করা হলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, আইনের চোখে সবাই সমান এবং পুলিশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে আইনানুগ পদক্ষেপ করবে। এই বিষয়ে প্রশাসন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল কোনোভাবেই কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না। নেতাজিকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং সমস্ত আপত্তিকর পোস্ট অবিলম্বে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, শুধুমাত্র পোস্ট ডিলিট করলেই আইনি প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ রেহাই পাওয়া যাবে না। এর পরেই সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে নিজের সাফাই দেন অনন্ত মহারাজ।
তবে এখনও পর্যন্ত নিজের বক্তব্যের জন্য তিনি প্রকাশ্যে কোনো ক্ষমা চাননি বলেই জানা গেছে। বরং তিনি পাল্টা হিসেবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। ঘটনাচক্রে, কিছুদিন আগে শমীক ভট্টাচার্যের একটি মন্তব্য ঘিরেও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। সেই সময় শমীকবাবুকে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, অতীতে যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মোহাম্মদ আলি পার্কে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, সেই সময় ফরওয়ার্ড ব্লকের গুন্ডারা তাঁর মাথায় পাথর মেরে তাঁকে রক্তাক্ত করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদের জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে তিনি একটু উত্তেজক নির্দেশ দিলেই বিপক্ষ দলের কেউ জীবিত থাকত না। এমনকি কলকাতা পুরসভার অন্দরে শ্যামাপ্রসাদকে কে নিগ্রহ করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক নাম প্রকাশ্যে আনলে নতুন রাজনৈতিক ঝড় উঠবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অনন্ত মহারাজ এদিন ঘুরিয়ে সেই বিতর্কের দিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।