চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু! ১১ ঘণ্টার মরণপণ লড়াই শেষে নিরাপদ ঠিকানায় গণ্ডার শাবক

মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং লোকালয়ে চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার এক দীর্ঘ ও বিপজ্জনক উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে নিরাপদ আশ্রয় ও নতুন ঠিকানা খুঁজে পেল একটি ছোট্ট গণ্ডার শাবক। প্রায় ১১ ঘণ্টার টানা ও নিরলস প্রচেষ্টার পর অবশেষে কুঞ্জনগর গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় দেড় বছরের ওই গণ্ডার শাবকটিকে। পরবর্তীতে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের হরিণডাঙা টাওয়ার সংলগ্ন সবুজ তৃণভূমিতে নিরাপদে ছেড়ে দেওয়া হয় উদ্ধার হওয়া ওই বন্যপ্রাণীটিকে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ। জলদাপাড়া পশ্চিম রেঞ্জের কুঞ্জনগর বিটের অন্তর্গত কুঞ্জনগর গ্রামে হঠাৎই ঢুকে পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী গণ্ডার ও তার ছোট্ট শাবক। বনদফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে, গভীর জঙ্গল থেকে তেড়ে আসা একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গণ্ডারের আগ্রাসী তাড়া খেয়েই তারা প্রাণভয়ে লোকালয়ে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে এই আকস্মিক ঘটনায় গোটা কুঞ্জনগরজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে সাধারণ বাসিন্দারা নিজেদের ঘরের দরজা ও জানালা শক্ত করে বন্ধ করে ভেতরে আশ্রয় নেন। উন্মত্ত গণ্ডারগুলি একাধিক বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায়।
কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা সেই দৌড়ঝাঁপ ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির চরম সমাপ্তি ঘটে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে। জঙ্গল ও জনবসতির সীমানায় লাগাতার দৌড়াদৌড়ির পর আচমকাই লোকালয়ের মধ্যেই প্রাণ হারায় পূর্ণবয়স্ক মা গণ্ডারটি। প্রাণহীন মায়ের দেহের ঠিক পাশেই অসহায়ের মতো একা দাঁড়িয়ে থাকে তার ছোট্ট অবুঝ শাবকটি। এই বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখে গভীরভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন স্থানীয় সাধারণ মানুষও। ঘটনার ব্রেকিং খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে পৌঁছয় জলদাপাড়া বন দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও সশস্ত্র বনকর্মীরা। একই সঙ্গে ফালাকাটা থানার পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে মৃত মা গণ্ডারটিকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে মায়ের মায়া ও আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আনুমানিক এক থেকে দেড় বছরের ওই কচি শাবকটি। এরপর দিশাহারা, আতঙ্কিত ও চরম উত্তেজিত অবস্থায় সে লোকালয়ের এদিক-ওদিক পাগলের মতো ছুটে বেড়াতে শুরু করে। শুরু হয় তাকে অক্ষত অবস্থায় নিরাপদে উদ্ধার করার এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও মরিয়া চেষ্টা। বনকর্মীরা জালের সাহায্য নিয়ে শাবকটিকে শান্ত ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সাধারণ মানুষের বিপুল ভিড় এবং শাবকটির চরম অস্থির ও আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে প্রথমদিকে কোনোভাবেই সাফল্য আসেনি।
পুরো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকাটি ত্রিস্তরীয় বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলে বন দফতর। কৌতূহলী সাধারণ মানুষকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখে শাবকটিকে কিছুটা শান্ত হওয়ার সুযোগ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে শুরু হয় কড়া ও নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দীর্ঘ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জলদাপাড়া বন্যপ্রাণী বিভাগের মোট ছয়টি রেঞ্জ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন অভিজ্ঞ বনকর্মী ও কুনকি হাতি এই বিশাল উদ্ধার অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। উদ্ধারকাজ চলাকালীন বন দফতরের পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা পালন করে।
অবশেষে সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল হয়ে উঠলে অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসক দলের নিবিড় তত্ত্বাবধানে শাবকটিকে ট্রাঙ্কুলাইজ বা বিশেষ ঘুমপাড়ানি গুলি করা হয়। এর অব্যবহিত পরেই বাঁশের তৈরি অত্যন্ত মজবুত বিশেষ কাঠামোর সাহায্যে অত্যন্ত সাবধানে ও সুকৌশলে তাকে উদ্ধার করে পরিবহণ খাঁচায় তোলা হয়। পরবর্তীতে একটি বড় ট্রাক্টরের মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে বহন করে তাকে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের হরিণডাঙা টাওয়ার সংলগ্ন ঘন তৃণভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই সফল উদ্ধারকার্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে জলদাপাড়ার ডিএফও পরভীন কাসওয়ান গণমাধ্যমকে জানান, “মঙ্গলবার গণ্ডার শাবকটি সম্পূর্ণ মা-হারা হয়ে পড়েছিল। আমাদের ৬০ থেকে ৭০ জন নিবেদিতপ্রাণ বনকর্মী ও কুনকি হাতির যৌথ প্রচেষ্টায় দীর্ঘ তল্লাশির পর তাকে ঘুমপাড়ানি গুলি করে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এরপর তাকে নির্বিঘ্নে জাতীয় উদ্যানের অভয়ারণ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
সন্ধ্যা ঠিক ৬টা ১৫ মিনিটে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেখানে সফলভাবে মুক্তি দেওয়া হয় গণ্ডার শাবকটিকে। উপযুক্ত খাবার উপযোগী ঘাসভূমি এবং কাছ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারির সুবিধা থাকায় এই নির্দিষ্ট বনাঞ্চল এলাকাটিকেই শাবকটির নতুন স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে অত্যন্ত সচেতনভাবে বেছে নিয়েছে বন দফতর। বর্তমানে প্রশিক্ষিত বনকর্মীদের কঠোর ও চব্বিশ ঘণ্টার কড়া নজরদারির মাঝেই বড় হবে শাবকটি। বিশেষ করে অন্য কোনো পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গণ্ডারের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে তাকে সবসময় নিরাপদ রাখা এবং বন্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সে কীভাবে ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে, সেই সমস্ত বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা নিশ্চিত করেছেন।
প্রাথমিক তদন্তের পর বন দফতরের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, দীর্ঘ সময় ধরে চলা দৌড়ঝাঁপ, উত্তেজনা এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের ফলেই সম্ভবত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মা গণ্ডারটির মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে। এই প্রসঙ্গে রাজ্যের বিশিষ্ট বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে জানান, “বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ বা চরম উত্তেজনার ফলে এমন ধরনের অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ময়নাতদন্তের মূল রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। বন্যপ্রাণীর সংখ্যা এমনিতেই অত্যন্ত কম, তার মধ্যে একটি সুস্থ সবল গণ্ডারের এহেন আকস্মিক মৃত্যু আমাদের সকলের জন্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”