খাতা-কলম নয়, পুলিশের পাঠশালায় জীবনের সুরক্ষা! প্রত্যন্ত গ্রামে এলেন খাকি উর্দির শিক্ষকরা

ত্রিপলের ওপর সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন বিভিন্ন বয়সের মহিলারা। কেউ গৃহবধূ, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ বা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তবে এটি কোনো স্কুল বা টিউশন সেন্টার নয়, এটি এক অন্যরকম পাঠশালা—যেখানে অঙ্ক বা ইংরেজির বদলে পড়ানো হয় জীবনযাপনের পাঠ, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা কবচ। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তথা আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের অন্তর্গত কাঁকসার জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামে এমন অভিনব উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন খাকি উর্দিধারীরা।

কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের বিনোদনপুর, শশীপুর ও ইটাডাঙার মতো দুর্গম গ্রামগুলিতে মলানদিঘি পুলিশ ফাঁড়ির উদ্যোগে আয়োজিত এই সচেতনতা শিবির যেন গ্রামীণ মহিলাদের চোখের সামনে নতুন দিশা খুলে দিয়েছে। মলানদিঘি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রাজেশ ভট্টাচার্যের বিশেষ ভাবনায় এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী ও মহিলা পুলিশকর্মীরা।

শিবিরের মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা কাটানো এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ থেকে তাঁদের সতর্ক করা। এদিনের পাঠশালায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বাল্যবিবাহ রোধের ওপর। পুলিশ স্পষ্ট ভাষায় জানায়, ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া শুধু আইনত অপরাধ নয়, বরং তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য চরম ক্ষতিকর। অভিভাবকদের বোঝানো হয়, সরকারি প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে মেয়েরা যাতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, সেই পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

এছাড়া, পারিবারিক হিংসা ও মহিলাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের মোকাবিলায় পুলিশ কীভাবে সাহায্য করতে পারে, সেই উপায়ও বাতলে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের মহিলারা সামাজিক লজ্জায় সমস্যার কথা বলতে পারেন না। পুলিশ তাঁদের অভয় দিয়ে বলেছে, বিপদ বা হয়রানির সময় কোনো সংকোচ ছাড়া পুলিশের দ্বারস্থ হতে হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম সাইবার জালিয়াতি। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন, সরকারি প্রকল্পের প্রলোভন দেখিয়ে ওটিপি চুরি বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা থেকে বাঁচতে পুলিশ আধিকারিকরা খুব সহজ ভাষায় সচেতন করেন। তাপস চক্রবর্তী উপস্থিত মহিলাদের কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেন, “অচেনা নম্বর থেকে আসা কলে ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না। অন্নপূর্ণা যোজনা বা অন্য কোনো সরকারি প্রকল্পের নাম করে কেউ ওটিপি চাইলে ভুলেও তা শেয়ার করবেন না।”

পুলিশের এই মানবিক মুখ দেখে গ্রামের মহিলারাও যথেষ্ট আশাবাদী। জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত কোণে খাকি উর্দির এই ‘শিক্ষকতা’ সমাজ পরিবর্তনের এক বড় ধাপ হয়ে উঠেছে। পুলিশ এখন শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং গ্রামের মানুষের নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছে—যাঁরা জীবন ও অধিকারের লড়াইয়ে গ্রামবাসীদের পথ দেখাচ্ছেন।