ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা! সুপ্রিম ডেডলাইনের আগেই কেন আটকে গেল পর্ষদের নিয়োগ প্রক্রিয়া?

তৃণমূল জমানায় নিয়োগ দুর্নীতির জেরে চাকরি হারানো প্রায় ছাব্বিশ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর ভবিষ্যৎ ফের এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সমস্ত নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের তরফে একাদশ ও দ্বাদশ স্তরের শিক্ষক পদপ্রার্থীদের নথি যাচাই বা ভেসিরিকেশন প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াটিই বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে গেল। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, রাজ্য সরকার কি তবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে নির্দিষ্ট সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন জানাবে, নাকি এই হাজার হাজার শিক্ষক আগামী দিনে সম্পূর্ণ বেতনহীন হয়ে পড়বেন?

আদালতের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, যতদিন না নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে শেষ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই শিক্ষকরা তাঁদের নিয়মিত বেতন পেতেন। সেই বেতন পাওয়ার আইনি মেয়াদ রয়েছে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। অন্যদিকে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে শিক্ষাকর্মীরা ইতিমধ্যেই নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। ফলে নির্দিষ্ট ওই ডেডলাইনের মধ্যে নিয়োগ পর্ব শেষ না হলে এই চাকরিহারারা চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়বেন। এর মধ্যেই গত সোমবার পর্ষদের তরফে একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয় যে, ১২, ১৩ এবং ১৭ আগস্ট যে নথি যাচাইয়ের পর্ব চলার কথা ছিল, তা অনিবার্য কারণে আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের গত ৭ আগস্টের একটি নির্দেশিকা মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এই হঠাৎ স্থগিতাদেশের পেছনে মূলত রয়েছে ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত দীর্ঘআইনি জটিলতা। ২০১০ সালের পর ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৭৭টি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। ২০২৪ সালের মে মাসের সেই হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল পূর্বতন রাজ্য সরকার। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে ওবিসি তালিকা সংক্রান্ত ওই মামলা সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। সেইমতো মামলা তুলে নেওয়ার পর ২০১০ সালের আগের সমীক্ষার ভিত্তিতে স্বীকৃত মাত্র ৬৬টি সম্প্রদায়কেই ওবিসি তালিকার অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে এবং বাকি ৭৭টি সম্প্রদায়ের ওবিসি স্বীকৃতি বাতিল হয়ে গিয়েছে। এই জটিল আইনি পরিস্থিতির ফলেই শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সিলিং ও ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া মাঝপথে আটকে রাখতে বাধ্য হয়েছে পর্ষদ।

এই আকস্মিক পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে আন্দোলনকারী শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল গণমাধ্যমের সামনে জানিয়েছেন যে, তাঁরা কেউই বুঝতে পারছেন না আগামী ৩১ আগস্টের পর তাঁদের কাজের ও চাকরির ঠিক কী পরিণতি হবে। তিনি ক্ষোভের সুরে জানান যে, এখনও পর্যন্ত নবম-দশমের ভেরিফিকেশন এবং একাদশ-দ্বাদশের কিছু কাউন্সিলিং প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে এবং কেউ হাতে এখনো নিশ্চিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাননি। তাঁরা বারবার মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অনুরোধ জানালেও এখনও পর্যন্ত কোনো সদুত্তর পাননি। এমতাবস্থায় রাজ্য সরকার এই সংকট কাটাতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের শিক্ষক সমাজ।