‘সংবিধানের স্বাধীনতা সকলের ঊর্ধ্বে!’ ইচ্ছামতো জীবন কাটানোর পূর্ণ স্বাধীনতাসহ দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনকে বড় স্বস্তি দিল হাইকোর্ট!

প্রাপ্তবয়স্ক কন্যাদের জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে বাড়িতে আটকে রাখার একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় অত্যন্ত কঠোর ও ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত এই মামলায় উত্তর প্রদেশ সরকার এবং মেয়েদের বাবা—উভয় পক্ষকেই যৌথভাবে ভুক্তভোগী দুই বোনকে ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি সন্দীপ জৈন একটি গুরুত্বপূর্ণ হেবিয়াস কর্পাস পিটিশনের শুনানি শেষে এই কড়া রায় ঘোষণা করেছেন। আদালতের এই রায়ের ফলে দুই বোন এখন নিজেদের ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় এবং নিজেদের পছন্দের ব্যক্তির সঙ্গেই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার আইনি অধিকার লাভ করেছেন। চলুন এক নজরে পুরো চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা যাক।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, দুই বোন একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করে আদালতে জানান যে তাঁরা হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আগ্রার সদর বাজার এলাকার বাসিন্দা অনিল কুমার ভাটিয়ার দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে—অংশু ভাটিয়া ওরফে আমিনা এবং দিয়া ভাটিয়া ওরফে জোয়া আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান যে, ২০২০ এবং ২০২১ সালে তাঁরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি, লোভ, মানসিক চাপ বা জবরদস্তি ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় এবং আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেই তাঁদের বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া তাঁদের জোর করে বাড়িতে বন্দি করে রাখেন। শুধু তাই নয়, মেয়েদের সমস্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশংসাপত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক পাসবুক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্রগুলো বলপূর্বক বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর পাশাপাশি, পুনরায় তাঁদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য বাবা তাঁদের ওপর লাগাতার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অকথ্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন বাবা আগ্রার সদর বাজার থানায় জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মিথ্যা অভিযোগ এনে একটি এফআইআর দায়ের করেন, যেখানে পরবর্তীতে কঠোর বিএনএস এবং উত্তর প্রদেশ ধর্মান্তর বিরোধী আইন ২০২১-এর বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে এই ধর্মান্তরের ঘটনাটি কোনো একটি সুসংগঠিত ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের এই দুর্বল যুক্তি সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে দিয়েছে। আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, নিছক কোনো অনুমান বা আশঙ্কার ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যেতে পারে না। ফলস্বরূপ, আদালত অবিলম্বে দুই বোনকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সাফ জানিয়ে দেয় যে তাঁরা দেশের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের পছন্দমতো স্থানে বসবাস করতে এবং পছন্দের মানুষের সঙ্গে থাকতে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
নিজের ৭০ পৃষ্ঠার অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিশদ আদেশে বিচারপতি সন্দীপ জৈন জোরালোভাবে স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসনই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) এবং ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ (ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার) দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে নিজের পছন্দের ধর্ম বেছে নেওয়ার এবং নিজের ইচ্ছামত জীবন পরিচালনা করার অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রদান করেছে। আদালত অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছে যে, কোনো বাবা শুধুমাত্র নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সন্তানদের সিদ্ধান্তের অমিল হওয়ার কারণে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে নিজের বাড়িতে জোর করে আটকে রাখতে পারেন না। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পারিবারিক বা পিতৃতান্ত্রিক অধিকার কখনোই সাংবিধানিক স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। একই সঙ্গে, আদালত এই পুরো ঘটনায় রাজ্য সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের নিস্ক্রিয় ভূমিকা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব পুলিশের থাকলেও তারা ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক প্রতিকার প্রদানে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে এবং প্রকারান্তরে বেআইনি আটক অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে।
আদালতের রায়ে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ওই দুই বোনকে ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট ২৫ লক্ষ টাকা প্রদান করতে হবে, যা আগামী আট সপ্তাহের মধ্যে বাবা এবং রাজ্য সরকার সমান ভাগে (প্রত্যেক বোনকে ১২.৫ লক্ষ টাকা করে) পরিশোধ করবে। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার চাইলে ক্ষতিপূরণের সেই অর্থের ৫০ শতাংশ বাবার কাছ থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট দোষী পুলিশ কর্মকর্তা বা সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে আইনি উপায়ে উদ্ধার করতে পারবে, যাঁদের চরম অবহেলার কারণে ওই দুই নারীর সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আদালত বাবাকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে যে আগামী সাত দিনের মধ্যে মেয়েদের সমস্ত মূল শিক্ষাগত সনদপত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক পাসবুক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি অবিলম্বে তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন দুই বোনের শান্তিপূর্ণ ও স্বাধীন জীবনে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং প্রয়োজনে তাঁদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়।