ইতিহাসই শেষ কথা বলবে! কয়লাকাণ্ডে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে সুপ্রিম কোর্টের ক্লিন চিটে বড় স্বস্তি!

“সংবাদমাধ্যম বা বিরোধী দলগুলোর চেয়ে ইতিহাস আমার প্রতি অনেক বেশি সদয় হবে,” ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার আগে সাংবাদিক সম্মেলনে কথাটি বলেছিলেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। দীর্ঘ প্রায় বারো বছর পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ঠিক সেই কথাটিই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হল। আলোচিত কয়লা ব্লক বণ্টন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ভারতের প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই-এর দেওয়া ক্লিন চিট কঠোরভাবে বহাল রেখেছে। এই ঐতিহাসিক রায়ের পর দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সনিয়া গান্ধী অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছেন যে, ইতিহাস ড. সিংকে অত্যন্ত বিনয়ী কিন্তু ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও সৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই চিরকাল মনে রাখবে।

শীর্ষ আদালত তার রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, সিবিআই-এর দাখিল করা ক্লোজার রিপোর্ট বাতিল করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমন জারির ক্ষেত্রে ট্রায়াল কোর্টের কোনো রকম আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না। যদিও ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রয়াত ড. মনমোহন সিং নিজের জীবনের এই মহাবিজয় স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি, তবে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও সততার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অভিযোগের একবারে চূড়ান্ত ও আইনি সমাপ্তি ঘটল।

সনিয়া গান্ধী তাঁর সুচিন্তিত নিবন্ধে লিখেছেন যে, ড. সিংয়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন আমলাতন্ত্র, সংবাদমাধ্যম, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরএসএস-এর সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত দল পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছিল। বর্তমান কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের কঠোর সমালোচনা করে সনিয়া স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ২০১৭ সালে রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদীর করা ‘রেইনকোট পরে স্নান করা’ সংক্রান্ত কটূক্তিটি ছিল ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্ট ও নিম্নমানের দৃষ্টান্ত। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসন সিবিআই এবং ইডির মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করছে, অথচ বিরোধী শিবির থেকে কোনো প্রভাবশালী নেতা বিজেপিতে যোগ দিলেই তাঁরা রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত ও ‘স্বচ্ছ’ তকমা পেয়ে যাচ্ছেন।

মনমোহন সরকারের অতুলনীয় কৃতিত্বের কথা তুলে ধরে সনিয়া গান্ধী জানান যে, ড. সিংয়ের প্রশাসনিক কালেই ভারত বিশ্বমঞ্চে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি দেখেছে। শিক্ষা অধিকার আইন (RTE), একশো দিনের কাজের প্রকল্প (MGNREGA), জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন, অরণ্যের অধিকার আইন এবং ঐতিহাসিক ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির মতো অসংখ্য যুগান্তকারী জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলি মূলত তাঁরই সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রত্যক্ষ ফল। পাশাপাশি, নিজের পুরো শাসনামলে ড. সিং একশোটিরও বেশি অবাধ সংবাদ সম্মেলন করে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে সর্বদা জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন, যা বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

সনিয়া গান্ধীর মতে, তৎকালীন ইউপিএ সরকারের অসাধারণ অর্থনৈতিক সাফল্য এবং সুশাসন থেকে সাধারণ দেশবাসীর নজর ঘোরানোর জন্যই অত্যন্ত সুকৌশলে ড. মনমোহন সিংয়ের ব্যক্তিগত সততা ও নিষ্ঠার ওপর ভিত্তিহীন আক্রমণ চালানো হয়েছিল। আজ সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ আইনি বিচার প্রক্রিয়ায় সেই সমস্ত অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।