‘পাঁচ নয়, পেলেটবিদ্ধ কমপক্ষে ১০!’ সংসদ চলো মিছিলে RTI-এর বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস

গত ২০ জুলাই দিল্লিতে পডুয়াদের ‘সংসদ চলো’ মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশি দমনপীড়ন ও পেলেট গান (Pellet Gun) ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত এই ঘটনায় মাত্র পাঁচজন আন্দোলনকারীর পেলেটবিদ্ধ হওয়ার কথা সামনে এলেও, সম্প্রতি তথ্যের অধিকার বা RTI আইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাসপাতালের সরকারি নথিতে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেল। RTI-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই দিন দিল্লির বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ছররা গুলি বা পেলেট ও প্রজেক্টাইলের আঘাত নিয়ে অন্তত ১০ জন আন্দোলনকারী চিকিৎসা করাতে ভর্তি হয়েছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ এবং দলের জাতীয় মুখপাত্র সাকেত গোখলে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন।

কোন হাসপাতালে কতজন ভর্তি হয়েছিলেন?

সাকেত গোখলের করা RTI-এর জবাবে দিল্লির হাসপাতালগুলি যে তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে:

  • লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল: RTI-এর জবাবে হাসপাতাল জানিয়েছে, গত ২০ জুলাই পেলেট, শট বা প্রজেক্টাইলের আঘাত নিয়ে অন্তত ৯ জন আহত ব্যক্তি সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই দিন ওই হাসপাতালে মোট ৮১ জন আহতকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৬ জন আন্দোলনকারী এবং ৩৫ জন পুলিশকর্মী ছিলেন। আহতদের মধ্যে ১৪ জনের মাথা ও মুখে, ৫ জনের হাড় ভাঙার এবং ৩৬ জনের শরীরে নানা আঘাতের চিহ্ন ছিল। এমনকি একজনের চোখ, শ্বাসযন্ত্র ও ত্বকে মারাত্মক আঘাতের উল্লেখ রয়েছে।

  • সফদরজং হাসপাতাল: ৭ অগাস্ট প্রাপ্ত RTI-এর জবাব অনুযায়ী, সফদরজং হাসপাতালেও ওই দিন পেলেট বা ছররা গুলির আঘাতে আহত এক তরুণকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতালের নথিতে এটিকে স্পষ্টভাবে ‘pellet injury – 1 case’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এই দুই হাসপাতালের সরকারি হিসাব মেলালে ২০ জুলাই পেলেট বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে আহতদের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে অন্তত ১০। তবে এখনও AIIMS এবং রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের RTI জবাব আসা বাকি থাকায় আহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পুলিশের দাবি বনাম বিস্ফোরক জেনারে ল ডায়েরি (GD Entry)

ঘটনার দিন থেকেই দিল্লি পুলিশ সাফ জানিয়ে আসছিল যে, রাজধানীতে আন্দোলন দমনে পুলিশ কোনো পেলেট গান ব্যবহার করেনি। অথচ, এই দাবির ঠিক উলটো ছবি ধরা পড়েছে পুলিশেরই অন্দরের নথিতে।

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী (CRPF)-এর বিশেষ শাখা ‘র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স’ (RAF)-এর পক্ষ থেকে একটি জেনারেল ডায়েরি (GD Entry) এন্ট্রি করা হয়। সেই নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, দিল্লি পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকের নির্দেশেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের পক্ষ থেকে অ্যান্টি-রায়ট গান এবং প্লাস্টিক পেলেট ফায়ার করা হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন CJP-এর প্রতিবাদ সামলাতে RAF অ্যান্টি-রায়ট গান থেকে দুই রাউন্ড এবং প্লাস্টিক পেলেট দুই রাউন্ড সহ মোট ৫৫টি নন-ইলেকট্রিক্যাল শেল ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। রাজধানীতে নিরস্ত্র ছাত্র-বিক্ষোভ দমনে পেলেট ব্যবহারের এই ঘটনা নজিরবিহীন।

এক ছাত্রের দৃষ্টিশক্তি হারানোর অভিযোগ ও আদালতের অবস্থান

২০ জুলাইয়ের ওই বিক্ষোভে পেলেট লেগে এক আন্দোলনকারীর চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেই দেশজুড়ে শোরগোল শুরু হয়। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সংবাদমাধ্যমের সামনে সেই ছাত্রকে হাজির করেছিলেন, যিনি দাবি করেছিলেন যে পুলিশের ছররা গুলিতে তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে।

যদিও পেলেট গানকে ‘কম প্রাণঘাতী’ (Less-lethal) অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবুও চিকিৎসকরা বহু বছর ধরেই এর ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। চোখ, স্নায়ু, রক্তনালী বা শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গে পেলেট লাগলে স্থায়ী অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে জম্মু-কাশ্মীরে পেলেট ব্যবহারের জেরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৬-১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট ও কেন্দ্র সরকার নির্দেশ দিয়েছিল যে, একান্তই বাধ্য না হলে এবং ‘শেষ অবলম্বন’ হিসেবেই কেবল পেলেট গান ব্যবহার করা উচিত।

এখন দেখার বিষয়, AIIMS এবং রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের রিপোর্ট সামনে এলে এই সংখ্যা আর কতটা বাড়ে এবং এই বর্বরোচিত হামলার নির্দেশ ঠিক কার বা কাদের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত কবে শুরু হয়।