হঠাত্ শুরু হওয়া হেঁচকির আসল রহস্য কী? জেনেনিন এর বৈজ্ঞানিক কারণ ও প্রতিকার

খাওয়ার মাঝখানে বা হঠাৎ করেই বিনা নোটিশে বেজে ওঠে হেঁচকি! অনেক সময় তা কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই থেমে যায়, আবার কখনও টানা অনেকক্ষণ ধরে চলতে থাকায় অস্বস্তির অন্ত থাকে না। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আমাদের শরীরে এই অদ্ভুত হেঁচকি ওঠার আসল কারণ বা রহস্যটা আসলে কী? চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং শারীরতত্ত্বের ভাষায় হেঁচকি ওঠার পেছনে রয়েছে এক আকর্ষণীয় প্রক্রিয়া। আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক হেঁচকি কেন ওঠে এবং তা দ্রুত কমানোর কার্যকরী উপায়গুলি কী কী:

হেঁচকি ওঠার আসল রহস্য কী?
আমাদের বুক ও পেটকে আলাদা করেছে একটি শক্তিশালী পেশি পর্দা, যার নাম ডায়াফ্রাম (Diaphragm)। আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন এই ডায়াফ্রাম নিচে নামে এবং শ্বাস ছাড়লে ওপরে ওঠে।

কিন্তু কোনো কারণে যদি এই ডায়াফ্রাম পেশিটি হঠাৎ করে উদ্দীপিত বা সংকুচিত (Spasm) হয়ে ওঠে, তবে ফুসফুসে দ্রুত বাতাস প্রবেশের চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের গলার ভেতরের ভোকাল কর্ড বা স্বরযন্ত্রটি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে পরিচিত সেই ‘হিক’ বা হেঁচকির শব্দ।

কেন এই স্প্যাজম বা সংকোচন ঘটে?

দ্রুত খাবার খাওয়া বা বেশি খাওয়া: তাড়াহুড়ো করে খাবার খেলে বা অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে পেট ফুলে যায় এবং ডায়াফ্রামে চাপ পড়ে।

কার্বনেটেড পানীয় বা সোডা: কোল্ড ড্রিংকস বা সোডা জাতীয় পানীয় পান করলে পাকস্থলীতে গ্যাসের সৃষ্টি হয়, যা ডায়াফ্রামকে উত্তেজিত করে।

হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডা খাবার: খুব ঝাল বা গরম খাবারের পর হঠাৎ ঠান্ডা জল বা বরফ খেলে স্নায়ুতে ধাক্কা লাগে।

মানসিক উত্তেজনা বা উদ্বেগ: অতিরিক্ত ভয় পেলে, নার্ভাস হলে কিংবা মানসিক চাপের কারণেও হঠাত্ হেঁচকি শুরু হতে পারে।

হেঁচকি কমানোর কার্যকরী উপায়গুলি কী কী?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেঁচকি কয়েক মিনিট থেকে বড়জোর আধঘণ্টার মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যদি এটি দীর্ঘক্ষণ ধরে বিরক্ত করে, তবে দ্রুত স্বস্তি পেতে নিচের ঘরোয়া উপায়গুলি মেনে দেখতে পারেন:

১. দীর্ঘশ্বাস ধরে রাখা (Holding Your Breath):
नाक (নাক) ও মুখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে তা অন্তত ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড আটকে রাখুন। এরপর ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এটি ডায়াফ্রামের পেশিকে শান্ত করতে সাহায্য করে।

২. ঠান্ডা জল পান করা (Drinking Ice-Cold Water):
এক গ্লাস ঠান্ডা জল ধীরে ধীরে ছোট ছোট চুমুকে পান করুন। অথবা জলের সঙ্গে এক টুকরো বরফ মুখে রেখে চুষতে পারেন। এটি ভেগাস নার্ভকে (Vagus nerve) উদ্দীপিত করে হেঁচকি থামাতে দারুণ কাজ করে।

৩. কাগজের ব্যাগে শ্বাস নেওয়া (Breathing into a Paper Bag):
একটি ছোট কাগজের ব্যাগ মুখের সামনে ধরে তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। এর ফলে রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা সামান্য বাড়ে, যা ডায়াফ্রামের সংকোচন বন্ধ করতে সাহায্য করে। (সতর্কতা: প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করবেন না)।

৪. জিভে সামান্য চিনি বা লেবুর রস দেওয়া:
জিভের ওপর এক চিমটি চিনি রেখে তা আস্তে আস্তে গলিয়ে খেতে পারেন, কিংবা সামান্য পাতিলেবুর রস বা এক ফোঁটা ভিনেগার মুখে দিতে পারেন। এর তীব্র স্বাদ স্নায়ুর মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে হেঁচকি বন্ধ করতে সাহায্য করে।

৫. হাঁটু বুকে চেপে ধরা (Knees to Chest):
মাটিতে শুয়ে পড়ে আপনার হাঁটু দুটি ভাঁজ করে বুকের কাছে টেনে আনুন এবং হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরুন। এই ভঙ্গিটি পাকস্থলীর গ্যাস বের করে দিতে এবং ডায়াফ্রামের ওপর থেকে চাপ কমাতে সাহায্য করে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি হেঁচকি টানা ৪৮ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে এবং সহজে না কমে, তবে তা অন্য কোনো বড় শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।