বয়স ৩৫ পেরোলেই কি সুগার মাপা জরুরি? কোন কোন লক্ষণে চিকিৎসকের কাছে ছোটা উচিত?

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলির মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। বহু বছর ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলেও শরীরে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায় না, যে কারণে চিকিৎসকরা একে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলে থাকেন। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে হৃদ্রোগ, কিডনি বিকল হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, স্নায়ুর ক্ষতি এবং রক্তনালীর নানা মারাত্মক জটিলতা ডেকে আনে। এই প্রাণঘাতী ঝুঁকি এড়ানোর সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হলো নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা। তবে সবার ক্ষেত্রে পরীক্ষার সময়সূচি বা নিয়ম এক নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন এবং জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে সুগার পরীক্ষার ব্যবধান আলাদা হয়।
সুস্থ মানুষের কতদিন পর পর পরীক্ষা করা উচিত?
যাঁদের ডায়াবেটিস নেই এবং বিশেষ কোনো ঝুঁকিও নেই, তাঁদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বয়সের পর নিয়মিত স্ক্রিনিং করা অত্যন্ত জরুরি। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী—
৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের অন্তত একবার খালি পেটে রক্তে শর্করা এবং প্রয়োজনে খাবারের পর সুগার পরীক্ষা করানো উচিত।
পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ১ থেকে ৩ বছর পর আবার পরীক্ষা করা যেতে পারে।
বয়স কম হলেও কাদের ঝুঁকি বেশি?
বয়স ৩৫ বছরের কম হওয়া সত্ত্বেও যদি অতিরিক্ত ওজন, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের অভ্যাস থাকে, তবে বছরে অন্তত একবার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এই সমস্ত কারণে অল্পবয়সেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
প্রি-ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিস রোগীদের পরীক্ষার রুটিন
প্রি-ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও যা এখনও ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তাকে প্রি-ডায়াবেটিস বলে। এই অবস্থায় জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে ভবিষ্যতে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে প্রতি ৬ মাস অন্তর সুগার পরীক্ষা করানো উচিত।
নিয়মিত ডায়াবেটিস রোগী: যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের সুগার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর এইচবিএ১সি (HbA1c) পরীক্ষাও করাতে হবে, যা গত তিন মাসের গড় শর্করার মাত্রা জানায়। সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকলে প্রতি ৬ মাসে একবার এই পরীক্ষা যথেষ্ট, তবে ওষুধ পরিবর্তন বা অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় প্রতি ৩ মাস অন্তর তা করাতে হয়।
গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা: গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের জেরে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে। তাই সাধারণভবে ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গ্লুকোমিটারে ঘরোয়া পরীক্ষা ও বিশেষ লক্ষণ
ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শে দিনে একাধিকবার গ্লুকোমিটারে সুগার মাপতে হতে পারে। অন্যদিকে টাইপ-২ রোগীরা সপ্তাহে ১-২ দিন বা মাসে কয়েকবার খালি পেটে ও খাবারের দুই ঘণ্টা পরে সুগার মেপে রেকর্ড রাখতে পারেন।
নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত যদি শরীরে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা দেয়:
বারবার অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা ও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
অতিরিক্ত ক্ষুধা সত্ত্বেও দ্রুত ওজন কমতে থাকা।
চোখ ঝাপসা দেখা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি ধরা বা শরীরের ক্ষত দীর্ঘদিনেও না শুকানো।
সচেতনতাই ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও সঠিক জীবনধারা মেনে চললে ডায়াবেটিসের মতো রোগকেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।