শুকিয়ে কাঠ ইউরোপের নদী! জলের নিচ থেকে বেরিয়ে এল আস্ত যুদ্ধজাহাজ ও হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন শহর!

গত কয়েক বছরে ইউরোপ মহাদেশজুড়ে ভয়াবহ খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে রাইন, ড্যানিউব এবং পো-এর মতো বিশ্বের অন্যতম প্রধান নদীগুলির জলস্তর প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ রূপটি পরিবেশবিজ্ঞানীদের কাছে এক গভীর অশনিসংকেত হলেও, বিশ্বের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের কাছে এটি বর্তমানে এক অভাবনীয় সুযোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। নদীর জল নজিরবিহীনভাবে সরে যাওয়ায় জলের তলায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস এখন নিজে থেকেই মাটির বুক ভেদ করে ভেসে উঠছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর আবিষ্কারটি হয়েছে হাঙ্গেরির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ড্যানিউব নদীতে। তীব্র খরায় জল এতটাই শুকিয়ে গেছে যে নদীর বুক থেকে আকস্মিকভাবে বেরিয়ে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের ডজনখানেক ধ্বংসপ্রাপ্ত জার্মান যুদ্ধজাহাজ। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত লাল ফৌজের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে জার্মান বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে এই জাহাজগুলি ডুবিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর জলের অতলে বন্দি থাকার পর অবশেষে মরচে ধরা সেই যুদ্ধজাহাজগুলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যা বর্তমানে একটি উন্মুক্ত ঐতিহাসিক জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি আরও অনেক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনও প্রকাশ্যে এসেছে। সার্বিয়ার ড্যানিউব নদীর অববাহিকায় খরার জেরে দেখা মিলেছে এক প্রাচীন রোমান শহরের ধ্বংসাবশেষের। প্রায় ১৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যা জলের অতলে ঢাকা ছিল, তা আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। প্রাচীন সেই শহরের অবশিষ্টাংশ, পাকা রাস্তাঘাট, প্রাচীন বাড়ির ভিত এবং রোমান সৈন্যদের সমাধিক্ষেত্র পর্যন্ত সাধারণের নজরে এসেছে।

অন্যদিকে, আরও বেশি অবাক করা ঘটনা ঘটেছে চেক প্রজাতন্ত্রে। সেখানকার একটি নদীর পারাপার অঞ্চল থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১০ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো প্রাচীন উলি ম্যামথের বিশাল দাঁত এবং হাড়ের বিভিন্ন টুকরো। গবেষক বিজ্ঞানীদের অনুমান, বরফ যুগের সুদূর অতীতে এই সমগ্র এলাকাটি ম্যামথদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র ছিল। বর্তমানের নদীর জল কমে যাওয়ার ফলে মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সেই অমূল্য জীবাশ্মগুলি মাটির গভীর থেকে ওপরে উঠে এসেছে।

ইতালির পো নদীর অবস্থাও সম্পূর্ণ ভিন্ন নয়। জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি জীবন্ত বোমা জলের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। পাশাপাশি প্রকাশ্যে এসেছে ১৬০ খ্রিস্টাব্দের একটি প্রাচীন গির্জার ধ্বংসাবশেষও, যা ১৯৫০ সালে একটি নতুন বাঁধ নির্মাণের সময় জলের নিচে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কেন ঘটছে এমন ঘটনা? জলবায়ু গবেষকদের মতে, লাগাতার খরা ও অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ইউরোপের ভূগর্ভস্থ জলাধার ও নদীগুলির জল দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জলের গভীরে সুরক্ষিত থাকা এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি জল সরে যাওয়ার ফলে হঠাৎ অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসায় দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই কারণে বিশ্বজুড়ে প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখন দ্রুত গতিতে এই অমূল্য ঐতিহাসিক বস্তুগুলি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজে নেমে পড়েছেন।

প্রকৃতির এই ভয়াবহ খরা একদিকে যেমন মানবজাতির সামনে এক বিরাট বিপদের ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই আমাদের অতীত ইতিহাসের এক অদ্ভুত জানালা খুলে দিয়েছে। নদীর বুক থেকে উঠে আসা ম্যামথের কঙ্কাল থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধজাহাজ—সবকিছুই যেন নীরব ভাষায় আমাদের হারানো অতীতের অজানা গল্প শোন বলছে। তবে এই প্রাচীন ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিধ্বংসী রূপটিকেও কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty