পুলওয়ামার সাধারণ গ্রাম থেকে দাগেস্তানের খাঁচা! কীভাবে ভারতের নতুন ‘এমএমএ সম্রাট’ হয়ে উঠলেন এই লড়াকু যুবক?

উপত্যকাজুড়ে এখন একটাই নাম—ওয়েস ইয়াকুব। এই তরুণ তুর্কি বিশ্ব কমব্যাট স্পোর্টসে রীতিমতো ঝড় তুলেছেন এবং তাঁর এই দুরন্ত সাফল্যে গোটা দেশ গর্বিত। আপাতত ভারতের ঘরে-ঘরে মিক্সড মার্শাল আর্টস বা এমএমএ-কে (Mixed Martial Arts) জনপ্রিয় করে তোলা এবং বিশ্বমঞ্চে ত্রাস সৃষ্টি করাই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ব্রেভ সিএফ ১০৭ টুর্নামেন্টে বুলগেরিয়ান ফাইটার ডেলিয়ান জর্জিভকে নির্মমভাবে হারিয়ে ওয়েস বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, গ্লোবাল এমএমএ রিংয়ে দাপট দেখাতে তিনি এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশেষ করে ডেলিয়ান সাধারণ কোনো যোদ্ধা নন; তিনি বিশ্বখ্যাত ইউএফসি (UFC) চ্যাম্পিয়ন ইলিয়া টোপুরিয়ার বিশ্বস্ত স্পারিং পার্টনার। ফলে টোপুরিয়ার এই ঘনিষ্ট সহযোগীকে রিংয়ে নামিয়ে কুপোকাত করার ঘটনা ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে এক সুবর্ণ ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

আধুনিক এমএমএ-র ইতিহাসে ইলিয়া টোপুরিয়া ওরফে ‘এল ম্যাটাডোর’ এক অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও অপ্রতিরোধ্য নাম। ইউএফসি-র ফেদারওয়েট এবং লাইটওয়েট বিভাগে তাঁর নিখুঁত বক্সিং কৌশল এবং অপরাজিত রেকর্ড বিশ্বজুড়ে রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এমন একজন অপরাজেয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নের স্পারিং পার্টনারকে রিংয়ে হারিয়ে ওয়েস গোটা বিশ্বকে এক স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক স্তরে সেরাদের অভিজাত তালিকায় তাঁর স্থান এখন পাকা। ১৯৯৮ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার মুররান গ্রামে জন্ম নেওয়া ওয়েসের লড়াইয়ের শুরুটা অবশ্য এত সহজ ছিল না। ২০১২ সাল নাগাদ তায়কোন্ডো ও কিকবক্সিংয়ের মাধ্যমে খেলাধুলায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। কমব্যাট স্পোর্টসে তাঁর সহজাত প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম তাঁকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। মার্শাল আর্টের বিভিন্ন বিভাগে তিনি দেশের মাটিতে এক ডজনেরও বেশি জাতীয় পদক অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে এমএমএ-র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে তিনি ক্যাজ-ফাইটিং বা খাঁচার লড়াইয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন।

ব্রেভ কমব্যাট ফেডারেশন বা ব্রেভ সিএফ-এ প্রথম রাউন্ডেই ডেলিয়ানকে ছিটকে দিলেও, পেশাদার সার্কিটে ওয়েসের পথ চলা সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৩ সালে দিল্লির ম্যাট্রিক্স ফাইট নাইট ১১-র মঞ্চে পেশাদার অভিষেক ঘটলেও সেই ম্যাচে তৃতীয় রাউন্ডে সাবমিশনের মাধ্যমে তাঁকে পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয়েছিল। তবে এই প্রাথমিক হোঁচট তাঁকে দমাতে পারেনি, বরং নিজের খামতিগুলো বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বিশ্বমানের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে গ্রাউন্ড ফাইটিং এবং রেসলিংয়ে আরও অনেক বেশি উন্নতি প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি এক বিরাট ঝুঁকি নেন এবং সোজা পাড়ি দেন সুদূর রাশিয়ার দাগেস্তানে। খবিব নুরমাগোমেদভ বা ইসলাম মাখাচেভের মতো বিশ্বসেরা রেসলারদের এই দুর্গে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি রেসলিং ডিফেন্স ও টেকডাউন কন্ট্রোলে নিজেকে একেবারে নিখুঁত করে তোলেন। সেই ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফল মেলে হাতেনাতে। ভারত, কাজাখস্তান ও চিনে টানা বেশ কয়েকটি দাপুটে জয় ছিনিয়ে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে অধ্যবসায়ই সাফল্যের চাবিকাঠি।

নিজের পেশাদার কেরিয়ার গড়ার পাশাপাশি সমাজের প্রতিও সমানভাবে দায়বদ্ধ এই লড়াকু তরুণ। ২০১৫ সালে তিনি নিজ জন্মভূমি পুলওয়ামায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘লায়নস ডেন মার্শাল আর্টস অ্যাকাডেমি’। গত এক দশকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে দুশোরও বেশি স্থানীয় তরুণ প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। শরীরচর্চা ও মার্শাল আর্টসের সঠিক দীক্ষা দিয়ে এলাকার যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচিয়ে সঠিক পথের দিশা দেখাচ্ছে এই অ্যাকাডেমি। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ওয়েসই প্রথম ফাইটার যিনি ব্রেভ কমব্যাট ফেডারেশনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে শুধু লড়েননি, বরং দাপুটে জয় ছিনিয়ে এনেছেন। উন্নত রেসলিং এবং আগ্রাসী স্ট্রাইকিংয়ের নিখুঁত কম্বিনেশনে তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ধারালো। বিচারকদের রায়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে ম্যাচের প্রথম রাউন্ডেই বিপক্ষকে নকআউট করা তাঁর বর্তমান ফাইটিং স্টাইলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আপাতত তাঁর একমাত্র পাখির চোখ হলো ইউএফসি রস্টারে সরাসরি জায়গা করে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সগর্বে ভারতের পতাকা ওড়ানো।