সাহেব মারতে বাংলায় প্রথম বোমা বিস্ফোরণ! মেদিনীপুরের মাটিতে ব্রিটিশ ট্রেন ওড়ানোর সেই দুঃসাহসিক ইতিহাস

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসে বহু রক্তক্ষয়ী অধ্যায় লুকিয়ে রয়েছে, যার মধ্যে বাংলার বিপ্লবীদের দুঃসাহসিক পরিকল্পনা আজও শিহরণ জাগায়। পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল ভাঙতে যখন দিকে দিকে গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠছে, তখন ব্রিটিশদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত এবং প্রফুল্ল চাকির মতো বীর যুবকরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকদের খতম করা। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার মাটিতে ব্রিটিশ সাহেবকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথম বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছিল বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড় অঞ্চলে, যা আজও আমাদের ইতিহাসের এক অত্যন্ত রোমহর্ষক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বঙ্গপ্রদেশে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো বড়সড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। এই আক্রমণের মূল নিশানায় ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ও অত্যাচারী ছোটলাট অ্যান্ড্রু ফ্রেজার। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অন্যতম কারিগর লর্ড কার্জনের প্রধান পরামর্শদাতা এই ফ্রেজার সাহেব বিপ্লবীদের কাছে চরম চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই কলকাতার গুপ্ত সমিতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল মেদিনীপুরের বিপ্লবী দল। ওড়িশার দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা পরিদর্শন শেষে ৬ ডিসেম্বর রাতে যখন ফ্রেজার সাহেবের বিশেষ ট্রেনটি ফিরছিল, ঠিক তখনই নারায়ণগড় স্টেশনের কাছে রেললাইনের নিচে ডিনামাইট বোমা পুঁতে রাখা হয়। বারীন ঘোষ তাঁর পরবর্তীতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, পরিকল্পনা নিখুঁত করার জন্য তিনি নিজেই ওই বিপজ্জনক মাইন পুঁতেছিলেন।

সেই সময় মেদিনীপুরের খ্যাতনামা বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো প্যারিসে অবস্থান করায়, উল্লাসকর দত্তের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে তৈরি শক্তিশালী বোমা এই অভিযানে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল। খড়গপুর থেকে ওড়িশাগামী বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে শাখার নারায়ণগড়ের এই রেললাইন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যতই নিখুঁত হোক না কেন, সামান্য কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও ভাগ্যের জোরে সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন ছোটলাট অ্যান্ড্রু ফ্রেজার। যদিও বিপ্লবীদের সেই লক্ষ্য সেবার শতভাগ সফল হয়নি, তবুও পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ঘটনা ছিল এক বিশাল যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বাংলার সেই প্রথম বিস্ফোরণ এবং বিপ্লবীদের বীরত্বের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে নারায়ণগড়ের রেললাইনের পাশেই ডহরপুর শবরপল্লিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রবোধকুমার ভৌমিকের উদ্যোগে এবং বিপ্লবী ভূপতি মজুমদারের করকমলে এই স্মৃতিস্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। আজ বহু দশক পরেও সেই স্তম্ভটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পরাধীন ভারতের সেই রক্তঝরা ডিসেম্বরের দিনগুলির ইতিহাসকে সযত্নে বহন করে চলেছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty