রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন! সরকারি ছুটির বহর বাড়লেও নবান্নে জারি কড়া নিষেধাজ্ঞা

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অভাবনীয় ও বিরাট পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়লাভ করে রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকার গঠন করার পর থেকেই নবান্নের অন্দরে শুরু হয়েছে সুদূরপ্রসারী সংস্কারের কাজ, যা রাজনৈতিক মহলে ‘বেঙ্গল রিসেট’ নামে পরিচিত। একদিকে নতুন সরকারের কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং কর্মসংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নজিরবিহীন প্রয়াস, অন্যদিকে সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৬ সালে বিগত বছরের তুলনায় ছুটির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ঘোষণা—সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রশাসনিক এই নতুন রূপরেখা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত সরকারি ছুটির তালিকায় রাজ্য সরকারের কর্মীদের জন্য মোট ৫৩টি ছুটি বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মোট ৪৯টি ছুটির তুলনায় চারটি বেশি। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মতো প্রধান উৎসবে টানা ১২ দিনের একটি দীর্ঘ ছুটি (১৫ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত) কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে ছুটির এই দীর্ঘ তালিকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রবিবারের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় রাজ্যবাসীর একাংশের মধ্যে আনন্দের আমেজ কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। শিবরাত্রি, কালীপূজা, ছটপূজা এবং বীরসা মুন্ডার জন্মদিনের মতো অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ ছুটি রবিবারে পড়ায় অতিরিক্ত ছুটির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কর্মীরা। উল্লেখ্য, এই ছুটির তালিকাটি অবশ্য পূর্বতন সরকারের কার্যকালে ২০২৫ সালের নভেম্বরেই বিজ্ঞপ্তিত হয়েছিল।
এদিকে ছুটির হিসাবের পাশাপাশি নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরেই প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে এক অত্যন্ত কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা এবং প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পূর্বতন সরকারের আমলে পুনরায় নিযুক্ত (Re-employed) হওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচশো জন ওএসডি (Officer on Special Duty) বা বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দপ্তরে প্রবেশ করতে বা অফিসে আসতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল মহলের একাংশের দাবি, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক প্রাক্কালে বা পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে সরকারি দপ্তরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় নথি বা ফাইল যাতে কোনোভাবেই নষ্ট, সরিয়ে ফেলা বা বিকৃত করা না হয়, তা সুনিশ্চিত করতেই এই বিশেষ ‘রেস্ট্রিকশন অর্ডার’ বা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন সরকার প্রশাসন থেকে অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও আধিকারিকদের একচ্ছত্র প্রভাব এবং বাড়তি সুবিধা পাওয়ার প্রবণতাকে চিরতরে খতম করতে চাইছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক স্তরে যে বিশেষ সুবিধা ও আধিপত্য বজায় ছিল, তাতে সরাসরি ইতি টেনে নবান্নের কর্মসংস্কৃতিতে এক নতুন ও জবাবদিহিমূলক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জোরালো বার্তা দিল বর্তমান প্রশাসন। আগামী দিনে এই প্রশাসনিক সংস্কার রাজ্যের সামগ্রিক কার্যপদ্ধতিতে কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে ওয়াকিবহাল মহলের।