সুড়ঙ্গ নয়, মিলল আস্ত এক প্রাচীন শহর! উত্তরপ্রদেশের মাটিতে লুকিয়ে আছে ২ হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস!

উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলী জেলা থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এক অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। সম্প্রতি জেলার হাচন্দপুর এলাকার ওেই ভাট গ্রামে প্রবল বৃষ্টির কারণে হঠাত্‍ করেই এক বিশাল ভূখণ্ড ধসে পড়েছিল। এই ঘটনার পরই এলাকায় একটি রহস্যময় প্রাচীন সুড়ঙ্গ পাওয়ার তীব্র গুঞ্জন ও জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালায়। তদন্তের পর সুড়ঙ্গের তত্ত্বটি পুরোপুরি খারিজ হয়ে গেলেও, তার পরিবর্তে মাটির নিচ থেকে প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো এক প্রাচীন ‘কুশাণকালীন নগরী’-র শক্তপোক্ত ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মিলেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল স্থানীয় এক প্রান্তিক কৃষক সুশীল মৌর্যর জমিতে। একটানা প্রবল বর্ষণের ফলে ওই কৃষকের জমির একটি বড় অংশ আকস্মিকভাবেই নিচে ধসে বসে যায়। মাটি ধসে পড়ার পর সেখানকার গভীর গহ্বরে প্রাচীন আমলের পোড়ামাটির বিশাল ইট দিয়ে তৈরি সুদৃঢ় প্রাচীর ও কাঠামোর দেখা মেলে। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় গ্রামবাসীর মনে করেন যে এটি প্রাচীন আমলের কোনো রাজা-মহারাজার তৈরি গোপন সুড়ঙ্গ। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর দাবানলের মতো সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।

গ্রামবাসীর জল্পনা ও সুড়ঙ্গের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সার্ভে (ASI)-র অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, সেখানে সাধারণ মানুষ যেমনটা ভাবছিলেন, তেমন কোনো গোপন পথ বা সুড়ঙ্গ থাকার বিন্দুমাত্র ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের চোখ এড়িয়ে যায়নি অন্য এক ঐতিহাসিক সত্য।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাটি ধসে যাওয়ার ফলে যে বিশাল আকৃতির প্রাচীন ইটগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, সেগুলোর মাপ, অনন্য গাঁথনি এবং কাঠামোগত গঠনশৈলী অবিকল প্রায় ২০00 বছর আগের কুশাণ সাম্রাজ্যের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি কোনো অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী প্রাচীন জনপদ, জনবহুল নগর বা বড় কোনো ঐতিহাসিক সভ্যতার অংশবিশেষ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইতিহাস গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের একটি বড় অংশের মতে, ওেই ভাট গ্রামের এই প্রাচীন টিলাটি আগামী দিনে ঐতিহাসিক তথ্যের এক অফুরন্ত খনি বা ভাণ্ডার হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের জোরালো দাবি, যদি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI) এবং উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার সম্মিলিতভাবে আধুনিক ভূ-পদার্থগত প্রযুক্তি বা জিও-ফিজিক্যাল মেথড প্রয়োগ করে এই এলাকায় নিয়মতান্ত্রিক ও ব্যাপক খননকার্য পরিচালনা করে, তবে উত্তরপ্রদেশের প্রায় দুই সহস্রাব্দের এক সোনালী ও প্রাচীন ইতিহাস জনসমক্ষে চলে আসবে।

ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, যদি এই খননকাজের মাধ্যমে কুশাণ যুগের প্রাচীন নগর সভ্যতার অস্তিত্ব পুরোপুরি প্রমাণিত হয়, তবে রায়বরেলী জেলা দেশের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এবং ঐতিহাসিক স্থানের তালিকায় মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ করবে। আপাতত স্থানীয় উৎসুক গ্রামবাসী এবং দেশের নামী-দামী ইতিহাস গবেষকদের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে এএসআই (ASI)-এর পরবর্তী পদক্ষেপ ও অনুমোদনের ওপর।